দেশে অর্থনৈতিক সংকট ও মূল্যস্ফীতির কারণে বেশিরভাগ মানুষ দৈনন্দিন খাবারের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক পরিবার খাদ্যের পরিমাণ কমাতে বাধ্য হচ্ছে। সম্প্রতি দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমশ কমছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশে পৌঁছেছিল। তখন প্রতি ১০ পরিবারের মধ্যে ৩টি পরিবার পর্যাপ্ত খাবার খেতে পারছিল না। বর্তমানে এ সংখ্যা বেড়ে ৬টিতে দাঁড়িয়েছে।
মঙ্গলবার (১৫ অক্টোবর) ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’ নেটওয়ার্ক আয়োজিত ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৫’ উপলক্ষে নেটওয়ার্ক সারা দেশে সপ্তাহব্যাপী প্রচার অভিযান কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
সভার সভাপতিত্ব করেন নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ও ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ, সমাজসেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক শিলা রানী দাস, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) এর গবেষণা পরিচালক ড. এস এম জুলফিকার আলী, ক্রিশ্চিয়ান এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর নুজহাত জাবিন এবং ওয়েল্ট হাঙ্গার হিলফে (ডাব্লিউএইচএইচ) বাংলাদেশ এর হেড অব প্রজেক্ট মো. মামুনুর রশিদ উপস্থিত ছিলেন। সঞ্চালনা করেন নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী কানিজ ফাতেমা।
সভায় বক্তারা বলেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘খাদ্য অধিকার আইন’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। মহসিন আলী উল্লেখ করেন, অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের খাদ্য পরিস্থিতি উন্নয়নে আইন থাকা অপরিহার্য।
ড. এম এম আকাশ বলেন, ক্ষুধা ও পুষ্টির মধ্যে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও প্রধান সমস্যা সুষম বণ্টনের অভাব।
শিলা রানী দাস জানান, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে ১ কোটি ২৭ লক্ষ মানুষকে সেবা দেয়া হচ্ছে, কিন্তু শহর এলাকায় তা পর্যাপ্ত নয়।
ড. এস এম জুলফিকার আলী বলেন, আয় বৈষম্য ও মূল্যস্ফীতি কমানো না হলে দরিদ্রদের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব নয়।
নুজহাত জাবিন দুর্যোগ সহনশীল খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। মো. মামুনুর রশিদ বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে ক্ষুধা নিরসনের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন কঠিন।
ড. আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, গণঅভ্যুত্থান ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে খাদ্য অধিকার গুরুত্বপূর্ণ চাওয়া ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার তা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তার মান কমেছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেই। তিনি সুপারিশ করেন, ভবিষ্যৎ নীতি প্রণয়নে খাদ্য অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, দক্ষতা উন্নয়ন ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ নেটওয়ার্কের সুপারিশে বলা হয়, খাদ্য অধিকার আইন দ্রুত প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা, বাজার মনিটরিং ও স্বল্পমূল্যে খাদ্য সরবরাহ বৃদ্ধি করা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিসর সম্প্রসারণ, দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকা ও জনগোষ্ঠীর জন্য বহুমুখী কর্মসূচি গ্রহণ এবং খাদ্য নিরাপত্তায় নাগরিক সমাজ, কৃষক, যুব, নারীসহ সবার অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার কথা।









