এক দশকের বেশি সময় ধরে স্থিতিশীল চালের আন্তর্জাতিক বাজার। কিন্তু সম্প্রতি ভারত চাল রফতানি বন্ধ ঘোষণা করার পর থেকে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা চরম আকার ধারণ করেছে। ফলে শস্যটির বৈশ্বিক দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

বিশ্লেষকরা জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে বৈরী আবহাওয়ার কারণে চাল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে চালের পর্যান্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভারত রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চালের বৈশ্বিক চাহিদা। এর ফলে খুব শিগগিরই চালের বাজারে উল্লম্ফন দেখা দিতে পারে।

ভারসাম্যহীন বৃষ্টিপাতের কারণে ভারতে ধান আবাদ ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণেই সেপ্টেম্বরে দেশটি রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরো করে। অন্যদিকে ভয়াবহ বন্যার কারণে পাকিস্তানে চাল উৎপাদনে বিপর্যয় নেমেছে। ঠিক উল্টো দিকে প্রধান ব্যবহারকারী দেশ বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনে ব্যবহার বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। আর এ কারণেই ২০২২-২৩ বিপণন মৌসুমে চালের বৈশ্বিক চাহিদা উৎপাদনকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ বিষয়টি এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কারণ এসব দেশের প্রধান খাদ্যশস্যই চাল। আবার কিছু কিছু দেশ চালের মোট চাহিদার ৬০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। সেসব দেশের সরবরাহ বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

ভারত ভাঙা চাল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য চালে ২০ শতাংশ রফতানি শুল্কারোপের পর শস্যটির বৈশ্বিক বাজারদর ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত মাসে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার চালের মূল্যসূচক ২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্য দিয়ে মূল্যসূচক ১৮ মাসের সর্বোচ্চে পৌঁছেছে।

ভারতের কৃষিপণ্য বিপণন প্রতিষ্ঠান ওলামের ভাইস প্রেসিডেন্ট নিতিন গুপ্তা বলেন, চালের আন্তর্জাতিক বাজার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠছে। শস্যটির দাম ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। 

কভিড-১৯ সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতার কারণে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ এখনো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংগ্রাম করছে। উৎপাদন ও সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখতে হিমশিম খাচ্ছে এসব দেশ। তার ওপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্যের সরবরাহ আরো কমেছে। ফলে বছরের শুরুর দিকে মূল্যস্ফীতি লাগামহীন হয়ে ওঠে, যা নিয়ন্ত্রণে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালাচ্ছে অর্থনীতিগুলো।

ভারত রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কয়েক মাস আগেও শিল্প ও সরকারসংশ্লিষ্টরা মনে করছিলেন, পর্যাপ্ত বৈশ্বিক মজুদের কারণে চালের বাজার স্থিতিশীলই থাকবে।

এদিকে ভারতের নিষেধাজ্ঞার কারণে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো অন্যান্য শীর্ষ রফতানিকারক দেশ রফতানি বাড়াচ্ছে। কমছে এসব দেশের মজুদও। এর ফলে আগামী বছর চালের বৈশ্বিক মজুদ কমে পাঁচ বছরের সর্বনিম্নে নামতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চালের বৈশ্বিক বাণিজ্যে ৪০ শতাংশ হিস্যাই ভারতের। ফলে বাণিজ্যে দেশটির বিকল্প হয়ে ওঠা অন্যান্য দেশের জন্য প্রায় কঠিন।

মার্কিন কৃষি বিভাগের দেয়া তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ বিপণন মৌসুমে চালের বৈশ্বিক উৎপাদন দাঁড়াবে ৫০ কোটি ৮০ লাখ টনে, যা চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এক মাস আগেও সংস্থাটির প্রত্যাশা ছিল, বৈশ্বিক উৎপাদন দাঁড়াবে ৫১ কোটি ২০ লাখ টনে।

যদিও কিছু কিছু বৈশ্বিক বিপণন প্রতিষ্ঠান উৎপাদন আরো কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০ কোটি টনে। চীন, ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো শীর্ষ উৎপাদক দেশগুলোয় ভয়াবহ বৈরী আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা বৈশ্বিক উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ভারতের রাইস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট বি ভি কৃষ্ণ রাও বলেন, প্রায় সব দেশেই উৎপাদন কমতির দিকে। এবার বৈশ্বিক চাহিদা সরবরাহকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এদিকে ভারতের রফতানি নিষেধাজ্ঞা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর রফতানি বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। বেশি সুবিধা পাচ্ছে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার। তবে এসব দেশের উদ্বৃত্ত মজুদ খুবই সীমিত। ফলে রফতানি বাড়াতেও দেশগুলো বিপাকে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।