প্রতিষ্ঠার ৩৩ বছরেও উৎপাদনমুখী হয়ে উঠতে পারেনি লালমনিরহাট বিসিক শিল্পনগরী। শিল্প-কারখানা স্থাপনের উদ্দেশ্যে যেসব প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, সেগুলোর বড় একটি অংশই পড়ে আছে অব্যবহৃত। এ শিল্পনগরীতে ৩৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ১০৭টি প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৩টি উৎপাদনে যেতে পারেনি। বাকি ১৪টি সচল থাকলে সেগুলো চলছে ঢিমেতালে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, জেলার ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যেই এ শিল্পনগরী গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার তিন দশকেও সে উদ্দেশ্য সফল হয়নি। শিল্পনগরীর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকারত্বের হার কমে আসার স্বপ্নও অধরাই রয়ে গেছে। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা প্লট পাননি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সাপ্টিবাড়ী ইউনিয়নে ১৯৮৭ সালে ১৫ একর ৬০ শতাংশ জমি কেনা হয় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) শিল্পনগরী গড়ে তোলার জন্য। ১৯৯০ সালে এটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার এত বছরেও এখানে কোনো ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি। এটিকে শিল্পবান্ধব করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। নানা অনিয়ম ও লোকসানের কারণে বিভিন্ন সময় অনেক প্রতিষ্ঠান প্লট ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে।
শিল্পনগরীর মেসার্স সিয়াম প্লাস্টিক সেন্টারের স্বত্বাধিকারী মো. শহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকৃত ব্যবসায়ীদের প্লট বরাদ্দ দিয়ে কারখানা সচল করা প্রয়োজন। তাহলে এখানে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে বিসিকও। কিন্তু এ উদ্যোগ এতদিনে কেউ নেয়নি।’
লালমনিরহাট বিসিক কার্যালয় সূত্র জানায়, শিল্পনগরীতে ১০৭টি প্লট রয়েছে। এর মধ্যে ‘এ’ ক্যাটাগরির ৭০টি, ‘বি’ ক্যাটাগরির ২৯ ও ‘সি’ ক্যাটাগরির আটটি। ‘এ’ ক্যাটাগরির প্রতিটি প্লটে জমির পরিমাণ ১০ শতাংশ, ‘বি’ ক্যাটাগরির প্রতিটি প্লটে ৫ শতাংশ ও ‘সি’ ক্যাটাগরির প্লটে ৩ শতাংশ। প্রতি শতাংশ জমির দাম ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা আছে। এসব প্লট ৩৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সচল, দুটি চালুর অপেক্ষায়, দুটি রুগ্ণ, পাঁচটি বন্ধ, সাতটি নির্মাণাধীন ও সাতটি নির্মাণের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব প্লটের মধ্যে খাদ্যজাত পাঁচটি, কৃষিভিত্তিক তিন, হালকা প্রকৌশল পাঁচ, কেমিক্যাল ১১, খাদ্যসহায়ক তিন, বস্ত্রজাত চার, প্লাস্টিকজাত তিন ও তিনটি ফার্নিচার কারখানা গড়ে তোলার কথা ছিল। তবে শিল্পনগরীটিতে এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো কারখানা গড়ে ওঠেনি।
বিসিক শিল্পনগরীর কারখানা মালিক সমিতিরও সভাপতি আব্দুস সালাম বকুল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেকেই প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন কিন্তু উৎপাদনমুখী কারখানা গড়ে তোলেননি। আবার কেউ কেউ শিল্প-কারখানা তৈরি করেছেন কিন্তু উৎপাদনে যাননি। এছাড়া কেউ কেউ শিল্প-কারখানা করার নামে প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন কিন্তু গোডাউন কিংবা ঘর নির্মাণ করেছেন।’ এখানে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেকে প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।
লালমনিরহাট বিসিক শিল্পনগরীর উপব্যবস্থাপক জুয়েল চন্দ্র সেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি বিসিকের লালমনিরহাট কার্যালয়ে যোগদান করার এক মাস হচ্ছে। আগের কোনো বিষয় আমার জানা নেই। যতটুকু জানি, এরই মধ্যে এ বিসিক শিল্পনগরীকে কর্মমুখর করে তুলতে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।
লালমনিরহাট বিসিক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার থানাপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান ও খুরশীদা বেগম ২০০৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর ২২ হাজার ৬০০ বর্গফুট জমি তথা এ ক্যাটাগরির ৩৬, ৩৭, ৪৪, ৪৫ ও ৪৬ নম্বর প্লট লালমনি পোলট্রি ফিড অ্যান্ড ভুট্টা প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজের নামে বরাদ্দ নেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এসব প্লট অব্যবহৃত ফেলে রাখা হয়। গত ২৬ জুন তাদের প্লটগুলো বাতিল করে নতুন করে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া মেসার্স কে রহমান, টুম্মা এগ্রো কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, ট্রেড এক্সেল এগ্রোসহ আরো কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দকৃত প্লট বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিক।
এ বিষয়ে জুয়েল চন্দ্র সেন বলেন, ‘আগে কিছু নয়-ছয় হয়েছে। এরই মধ্যে প্লট বরাদ্দ নিয়ে ফেলে রাখা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্লট বাতিল করে নতুন প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। নতুন করে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সচল হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া নতুন প্লটগুলোয় দ্রুত কারখানা চালু হওয়ার কথা রয়েছে।’
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ উল্ল্যা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিসিক শিল্পনগরীকে উৎপাদনমুখী করে তুলতে এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া শুরু হয়েছে। কয়েকটি প্লট বাতিল করে নতুন করে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আরো কয়েকটি প্লট হস্তান্তর এবং বরাদ্দ বাতিলের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’









