ফলে প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে পড়ছে। জনমিতিক সুবিধা, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং কম খরচে বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নীতিগত অনিশ্চয়তা, দুর্বল সুশাসন এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিনিয়োগ প্রবাহ কমেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক ও উন্নয়ন সহযোগীরা।

রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল ‘উন্নত বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য সহায়ক রাজস্ব নীতি’ শীর্ষক এক বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন। ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ নির্ধারণে আর্থিক নীতি প্রধান ভূমিকা পালন করে। এটি কর ব্যবস্থা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ব্যক্তি পর্যায়ে সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছে ঝুঁকি, স্থিতিশীলতা, পূর্বাভাসযোগ্যতা ও নীতিগত ধারণা দেয়।’

এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘একটি দেশের আর্থিক নীতির গুণগত মানই নির্ধারণ করে সেই দেশে বিনিয়োগ কতটা আকর্ষণীয় হবে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ নীতিগত কাঠামো এখনো কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পারেনি, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক বিভিন্ন সূচক ও বিশ্লেষণে।’ একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশ এখনো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিনিয়োগ প্রবাহেও একই অবস্থা বলে মনে করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘এ সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ প্রবাহের ওপর। বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে জিডিপির প্রায় ২৪ শতাংশে স্থিতিশীল থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা ২২ শতাংশে নেমেছে। এফডিআই আকর্ষণেও সম্ভাবনা অনুযায়ী প্রতিযোগিতা করতে পারছে না। যদিও এখানে জনমিতিক সুবিধা, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং কম খরচে বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। অথচ নীতিগত অনিশ্চয়তা, দুর্বল সুশাসন এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ফলে অর্থনীতির বৈচিত্র্যকরণ, এলডিসি-পরবর্তী প্রস্তুতি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ এফডিআই প্রত্যাশা পূরণে ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে।’

মাসরুর রিয়াজ আরো বলেন, ‘আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সূচকে রাজস্ব শৃঙ্খলা নীতি, উন্মুক্ত বাজেট সূচক, সরকারি কার্যকারিতা এবং আর্থিক টেকসইতার দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো লাল ক্যাটাগরিতে রয়েছে। বিপরীতে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। কর ব্যবস্থার জটিলতা ও অকার্যকারিতাও বিনিয়োগ পরিবেশকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। কর প্রদানে সময় ও জটিলতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।’

বৈঠকে এফআইসিসিআই বোর্ড সদস্য শামস জামানের পরিচালনায় একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য নিযুক্ত বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বাংলাদেশ মিশনের কান্ট্রি ইকোনমিস্ট চন্দন সাপকোটা, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এবং বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারম্যান আবুল কাসেম খান।

জ্যঁ পেম তার বক্তব্যে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে জোর দেন। তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে তার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। বিশেষ করে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত হওয়া, টেকসই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। দ্বিতীয়ত, বিষয়টি কেবল বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আপনারা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধিত্ব করলেও দেশীয় বিনিয়োগকারীদের গুরুত্ব সমানভাবে বিবেচনা করা জরুরি। সামগ্রিকভাবে বেসরকারি বিনিয়োগে একটি ঘাটতি রয়েছে।’ অনেক সময় বিদেশী বিনিয়োগের ওপর অতিরিক্ত জোর দিতে গিয়ে দেশীয় সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তরের বিষয়টি উপেক্ষিত থাকছে বলেও দাবি করেন তিনি।

প্যানেল আলোচনায় এডিবির কান্ট্রি ইকোনমিস্ট চন্দন সাপকোটা বলেন, ‘বাংলাদেশে একাধিক বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা রয়েছে, তবুও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সবকিছুর ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে। তারা বিনিয়োগ সহজীকরণের কিছু উদ্যোগ নেয়, কিন্তু বছরের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ কোনো প্রজ্ঞাপন বা গেজেট জারি করে তা বাতিল করে দেয়। ফলে ভবিষ্যতে কী হবে, তার কোনো পূর্বানুমানই থাকে না।’ বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি একটি বড় বাধা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘এনবিআরকে প্রতি বছর উচ্চাভিলাষী ও বড় অংকের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়, কিন্তু অর্থবছর শেষে তা পূরণ হয় না। ফলে এটি একটি ধারাবাহিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং এটি অনেকাংশে রাজনৈতিকও। আর এ সমস্যা প্রযুক্তিগত দুর্বলতার মাধ্যমে প্রকাশ পায়।’

দেশে রাজস্ব খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান—উল্লেখ করে বিল্ড চেয়ারম্যান আবুল কাসেম খান বলেন, ‘এনবিআর থেকে শুরু করে নীতি বাস্তবায়নের প্রতিটি স্তরেই আমরা বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। তাই এসব সমস্যাকে একটি নির্দিষ্ট খাতে সীমাবদ্ধ করে দেখা সম্ভব নয়।’ তার মতে, নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।

বৈঠকে এফআইসিসিআইয়ের সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী এবং জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি দীপাল আবেইউইক্রেমাসহ অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।