সদ্য শেষ হলো ২০১৯ সাল। শুরু হলো নতুন দশক। বৈশ্বিক রাজনীতি- ভূরাজনীতি নিয়ে আলোচনা ছিল সারা বছর। এর প্রভাব ছিল বৈশ্বিক পণ্যবাজারে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধ, ইরান ও ভেনিজুয়েলার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বন্যা-খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব ছিল বছরজুড়ে। ফলে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় চাঙ্গা ছিল অনেক কৃষিপণ্যের বাজার। আবার উদ্বৃত্ত সরবরাহে জ্বালানি তেলসহ অনেক পণ্যের দাম ছিল নিম্নমুখী। পুরো বছর কেটেছে উদ্বৃত্ত সরবরাহ ও সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায়। গত বছরের বৈশ্বিক পণ্যবাজারের পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনার প্রয়াস আজকের আয়োজনে—
জ্বালানি বাজার: ২০১৯ সালে মন্দা ভাব ছিল জ্বালানির বাজারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খারাপ সময় পার করতে হয়েছে জ্বালানি তেলের। জ্বালানিটির বাজারে বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল ওপেক, ওপেক প্লাস জোট, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার নাম। বছর শেষে আলোচনায় আসে ব্রাজিলও। গেল বছর জ্বালানি তেলের উদ্বৃত্ত সরবরাহে নিম্নমুখী ছিল বাজার। ওপেক ও ওপেক প্লাস জোটের উত্তোলন ও সরবরাহ কমিয়ে দিয়েও কোনোভাবে বাজার চাঙ্গা করা সম্ভব হয়নি। উপরন্তু যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, নরওয়ের মতো দেশগুলোর কাছে বাজার হিস্যা হারিয়েছে সৌদি আরব, রাশিয়ার মতো শীর্ষ উত্তোলনকারী দেশগুলো।
গত বছর জ্বালানি তেলের বাজারে সবচেয়ে চাঙ্গা ভাব ছিল সেপ্টেম্বরে। এ মাসে জ্বালানিটির শীর্ষ উৎপাদক সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি আরামকোর দুটি স্থাপনায় ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। এতে দেশটির দৈনিক উত্তোলন ৫৭ লাখ ব্যারেল কমে আসে, যা দেশটির দৈনিক উত্তোলনের অর্ধেক, আর বৈশ্বিক উত্তোলনের ৫ শতাংশের বেশি। এতে সরবরাহ সংকটে জ্বালানি তেলের দাম ২০ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলার পর্যন্ত ওঠে। কিন্তু দেশটির দ্রুত উত্তোলন সক্ষমতা ফিরে আসায় আবারো দাম কমতে থাকে জ্বালানিটির।
এছাড়া সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায়, মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের নেতিবাচক-ইতিবাচক আলোচনায়ও বিভিন্ন সময় জ্বালানি পণ্যটির দাম ওঠানামা করে। আর গত বছরের শেষ দিন মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬৫ ডলার ৯৩ সেন্ট এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলার ৮৬ সেন্টে দাঁড়ায়।
জ্বালানি তেলের বাজারে অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল ওপেক প্লাস জোটের উত্তোলন কমানোর বিষয়টি। গত বছর জোটটি দৈনিক উত্তোলন ১২ লাখ ব্যারেল এবং এ বছরে অতিরিক্ত আরো পাঁচ লাখ ব্যারেল কমিয়ে আনছে। অর্থাৎ এ বছরের মার্চ পর্যন্ত জোটটি দৈনিক ১৭ লাখ ব্যারেল উত্তোলন কমিয়ে আনবে। শেল অয়েলের ওপর ভর করে জ্বালানি তেলের বাজারে ক্রমে আধিপত্যশীল হয়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রের উত্তোলন ও সরবরাহের বিষয়টি নিয়েও বেশ আলোচনা হয়েছে গত বছর। এছাড়া ব্রাজিলের উত্তোলন প্রবৃদ্ধিও জ্বালানি তেলের বাজারে আলোচনায় ছিল।
বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে গত বছরের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে কাতারকে হটিয়ে অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ এলএনজির রফতানিকারক দেশ হয়ে ওঠা, জার্মানিসহ ইউরোপের দেশগুলোয় কয়লার ব্যবহার কমিয়ে আনার প্রয়াস ইত্যাদি। এর বিপরীতে চীন ও ভারতের কয়লা ব্যবহার বৃদ্ধি, কয়লা উত্তোলনে রাশিয়ার উচ্চাভিলাষী কর্মপরিকল্পনাও জ্বালানি পণ্যের বাজারে প্রভাব ফেলেছে।
ধাতুর বাজার: এদিকে মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির শ্লথগতির প্রভাব ছিল ধাতুর বাজারেও। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাঙ্গা ছিল স্বর্ণের বাজার। দফায় দফায় বেড়েছে মূল্যবান ধাতুটির দাম। দাম বৃদ্ধির এ জেরে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ স্বর্ণ ব্যবহারকারী দেশ ভারতের বাজারে ভরা মৌসুমেও ধাতুটির কেনাবেচায় রীতিমতো ভাটা পড়ে।
বাণিজ্যযুদ্ধের অনিশ্চয়তায় সেফ হেভেন হিসেবে এ সময়ে স্বর্ণে বিনিয়োগ বাড়ায় ধাতুটির বাজার চাঙ্গা ছিল। স্বর্ণের পাশাপাশি এ সময় প্যালাডিয়ামের দামও বাড়তে থাকে সমানতালে। সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় প্যালাডিয়ামের দাম আউন্সপ্রতি ১ হাজার ৯৩৫ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা ২০১১ সালের পর সর্বোচ্চ। মূল্য বৃদ্ধিতে পিছিয়ে ছিল না রুপা ও প্লাটিনামেরও। গত বছর ধাতু দুটির মূল্য যথাক্রমে ১৫ ও ২১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়।
তবে এর বিপরীত চিত্র অ্যালুমিনিয়াম ধাতুর বাজারে। বাণিজ্যযুদ্ধের জেরে গাড়ি নির্মাণে ধাতুটির চাহিদা কমে আসে। যে কারণে উদ্বৃত্ত সরবরাহে গেল বছর ধাতুটির দাম টনপ্রতি ৩০০ ডলার ছাড়াতে পারেনি। ফার্স্ট মার্কেটের বেঞ্চমার্কসূচক অনুযায়ী, গত নভেম্বরে ধাতুটির গড় দাম টনপ্রতি ২৭৯ ডলার ৫৬ সেন্ট পর্যন্ত ওঠে। যেখানে বছরের শুরুতে দাম ছিল টনপ্রতি ৩৮১ ডলার ৬৯ সেন্ট। সেই হিসাবে, ধাতুটির দাম কমেছে ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধিকে সামনে রেখে শীর্ষ রফতানিকারক ইন্দোনেশিয়ার নিকেল রফতানি বন্ধের পূর্বাভাসে বছরের মাঝামাঝি সময়ে ধাতুটির বাজারেও অস্থিরতা ছিল বেশ। এছাড়া বছরজুড়ে ইস্পাত উৎপাদনে বাজারে আধিপত্য বজায় রেখেছিল চীন। বৈশ্বিক ইস্পাতের উৎপাদন ও ব্যবহারে বরাবরই শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছিল দেশটি।
কৃষিপণ্যের
বাজার:
কৃষিপণ্যের মধ্যে গত সেপ্টেম্বর থেকে বৈশ্বিক আলোচনায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে ছিল পেঁয়াজ। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে নাইজেরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য থেকে শীর্ষ রফতানিকারক দেশ ভারত পর্যন্ত সর্বত্র লাগামহীনভাবে বেড়ে যায় মসলাজাতীয় পণ্যটির দাম। এশিয়ার মধ্যে পেঁয়াজের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার ভারতের মহারাষ্ট্রের লাসালগাঁওয়ে এক বছরের ব্যবধানে পণ্যটির দাম নয় গুণের বেশি বাড়ে। ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর লাসালগাঁওয়ে প্রতি কুইন্টাল পেঁয়াজের দাম ছিল ৯২৫ রুপি, যা চলতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর এসে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৬০০ রুপিতে। ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে সরবরাহ সংকটে রফতানি বন্ধ ও আমদানি করেও পেঁয়াজের লাগাম টানতে ব্যর্থ হয় ভারত। দেশটির বাজারে মসলাপণ্যটির দাম কেজিপ্রতি ১৫০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। আর বাংলাদেশে পণ্যটির দাম কেজিপ্রতি ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়।
তবে বছরজুড়ে অন্যান্য কৃষিপণ্যের মধ্যে গম, ভুট্টা, চাল, রাবার, পাম অয়েলসহ ভোজ্যতেলের বাজারেও কমবেশি ওঠানামা অব্যাহত ছিল। এর মধ্যে বছরের মাঝামাঝি সময়ে শীর্ষ রাবার উৎপাদক দেশ থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার রাবার বাগানে ছত্রাকের উপদ্রবে সরবরাহ সংকটে কিছুদিন পণ্যটির দাম বাড়ে। আর অস্ট্রেলিয়ায় বছরজুড়ে খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য প্রধান বাধা ছিল খরা। দেশটিতে খরার কারণে শীর্ষ গম রফতানিকারক হওয়া সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে আমদানিতে ঝুঁকতে হয়েছে। একই কারণে দেশটির দুগ্ধশিল্পও মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে।
এছাড়া অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়া সত্ত্বেও ফিলিপাইনের চাল আমদানিতে প্রবৃদ্ধি, চালের চোরাচালান ঠেকাতে নাইজেরিয়ার সীমান্ত বন্ধে অভ্যন্তরীণ বাজারে খাদ্যপণ্যটির লাগামহীন দাম আলোচনায় ছিল। চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ বেশি থাকায় বছরজুড়ে চালের দাম অনেকটাই নিম্নমুখী ছিল। যদিও বছরের একেবারে শেষে দ্বিতীয় শীর্ষ রফতানিকারক থাইল্যান্ডের বেঞ্চমার্কে ৫ শতাংশ ভাঙা চালের রফতানিমূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২৪-৪৩৫ ডলারের মধ্যে। বছর শেষে ভিয়েতনাম, ভারতের চালের রফতানিমূল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে চিনি উৎপাদনে অন্যতম শীর্ষ দেশ ভারতের রফতানিতে ভর্তুকি সুবিধা পণ্যটির আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। নিজেদের উদ্বৃত্ত মজুদ কমাতে ভর্তুকি সুবিধা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনি সরবরাহের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিএ) কাছে অভিযোগও দায়ের করে ব্রাজিল। দেশটির অভিযোগ, ভারতের অতিরিক্ত কম দামে অতিরিক্ত চিনির সরবরাহে দুই বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমেছে ২০ শতাংশ। এর পরও ভারত ২০১৯-২০ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক বাজারে ৫০ লাখ টনের মতো চিনি রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অন্যদিকে ভোজ্যতেলের বাজারে গেল বছর আধিপত্য ধরে রেখেছিল পাম অয়েল। পণ্যটির অন্যতম শীর্ষ উৎপাদক ও রফতানিকারক দেশ ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার উৎপাদন বৃদ্ধি-হ্রাসের সঙ্গে পণ্যটির দামও ওঠানামা করে। বছরের প্রথমার্ধে পাম অয়েলের বাজার নিম্নমুখী থাকলেও শেষের দিকে এসে বাজার চাঙ্গা হয়। বিশেষ করে পাম অয়েলের ব্যবহার বাড়াতে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার বায়োডিজেল খাতে পণ্যটির হিস্যা যথাক্রমে ৩০ শতাংশ ও ২০ শতাংশ করার সিদ্ধান্তে পাম অয়েলের দাম বাড়তে থেকে। এছাড়া মার্কিন-চীন বাণিজ্য আলোচনার অগ্রগতির সুবাদে গত বছরের শেষের দিকে দেশ দুটির মধ্যে সয়াবিন বাণিজ্যেও বেশ গতি আসে।
সূত্র: রয়টার্স, মেটাল বুলেটিন ও ব্লুমবার্গ









