ট্রেডমার্কের মাধ্যমে মূলত কোনো পণ্যের পরিচয়, মালিকানা ও সুনাম সুরক্ষিত থাকে। সেলিব্রিটি বা পাবলিক ফিগারদের ক্ষেত্রে এটি পরিচয় সুরক্ষার কাজ করে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ট্রেডমার্ক ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহার হলে সেখান থেকে বড় অংকের অর্থ আয় করতে পারে ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। এ কারণে পরিচয় সুরক্ষার পাশাপাশি ট্রেডমার্ককে পুঁজি হিসেবেও ব্যবহার করেন সেলিব্রিটিরা। এক্ষেত্রে তারা এমন আইনি অধিকার লাভ করেন, যা সাধারণ ব্যবসায়িক পণ্য থেকে আলাদা। এ পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাব্য আর্থিক লাভের বিষয়টি বিবেচনায় সম্প্রতি ট্রেডমার্ক পেতে আবেদনের পরিমাণ বেড়েছে।

ইউরো নিউজের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত মাসের শুরুর দিকে পপ আইকন টেইলর সুইফট নতুন অ্যালবাম ‘‌দ্য টর্চার্ড পোয়েটস ডিপার্টমেন্ট’-এর গান ‘‌ফিমেল রেজ: দ্য মিউজিক্যাল’-এর জন্য ট্রেডমার্কের আবেদন করেছেন। অবশ্য এটিই তার প্রথম ট্রেডমার্ক আবেদন নয়। এর আগেও এ আন্তর্জাতিক তারকা তার ব্র্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত বেশকিছু বিষয়ে আইনি অধিকার পেতে আবেদন করেন। যার আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার।

নাম, আদ্যক্ষর ও অ্যালবামের শিরোনাম ট্রেডমার্ক করার পাশাপাশি আরো কিছু অদ্ভুত অনুরোধের জন্য টেইলর সুইফট খবরের শিরোনাম হয়েছেন বেশ কয়েকবার। এ কারণে বাণিজ্যিকভাবে তার কোনো গান ব্যবহার করা হলে ভিন্ন ভিন্ন ধারায় আইন জটিলতায় পড়তে পারেন সংশ্লিষ্টরা। মজার বিষয় এতে গানের যেকোনো অংশ আলাদাভাবে ব্যবহারও জটিলতা তৈরি করতে পারে। যেমন গানের লাইনও ট্রেডমার্ক করে রেখেছেন এ গায়িকা। এমন লাইনের মধ্যে রয়েছে ‘দিস সিক বিট’ বা ‘রেডি ফর ইট?’। অর্থাৎ এ লাইনগুলো বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারে টেইলর সুইফটের অনুমোদন লাগবে, দিতে হবে রয়্যালটিও।

এদিকে ‘‌সুইফটমাস’ শব্দটির জন্যও ট্রেডমার্ক পেয়েছেন টেইলর সুইফট। এমনকি বাদ যায়নি তার বিড়ালের নামও। এসব নামের মধ্যে রয়েছে মেরেডিথ, অলিভিয়া ও বেঞ্জামিন সুইফট।

অবশ্য পপ গানের জগতে নিজের পরিচয় ও ব্র্যান্ড সুরক্ষার জন্য সর্বপ্রথম আইনি অধিকারের আবেদন করেছিলেন ম্যাডোনা। আশির দশকে তার ট্রেডমার্ক আবেদনের পর থেকে বিষয়টি সেলিব্রিটিদের মধ্যে সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তার নির্বাচনী স্লোগান ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’-এর ট্রেডমার্ক মালিকানা পেয়েছেন।

এ বিষয়ে চার্টার্ড ট্রেডমার্ক অ্যাটর্নি জেরি ব্রিজ-বাটলার বলেন, ‘পাবলিক ফিগারদের ব্র্যান্ড নাম সাধারণত তাদের কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে না। তবে তাদের জনপ্রিয়তা একটি নির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছে গেলে নামও একটি শক্তিতে পরিণত হয়। এ কারণে নাম কোনো পণ্যের ব্র্যান্ডিংয়ে ব্যবহার করা যায়। কারণ কোনো পণ্যে টেইলর সুইফট ব্র্যান্ড নেম হলে তার ভক্তরা প্রচুর পরিমাণে কিনবেন।’

ফোর্বস ম্যাগাজিনের এক পরিসংখ্যান অনুসারে, গত বছর শুরু হওয়া ‘দ্য ইরাস ট্যুর’ থেকে পণ্য বিক্রি থেকে লাভবান হয়েছেন টেইলর সুইফট। নিজের নাম-ছবিসংবলিত টি-শার্ট ও অন্যান্য আইটেম বাবদ প্রায় ২০ কোটি ডলার আয় করেন তিনি।

আরেক চার্টার্ড ট্রেডমার্ক অ্যাটর্নি শার্লট ওয়াইল্ডিংয়ের মতে, ট্রেডমার্ক হলো একটি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা। যার মাধ্যমে একজন তারকা তার সম্মানহানি হয় এমন কোনো কাজে নামের ব্যবহার প্রতিরোধ করতে পারেন।

অবশ্য সবসময়ই যে পাবলিক ফিগারদের পক্ষে নাম বা প্রতিনিধিত্বমূলক কোনো চিহ্নের মালিকানা পেয়ে থাকেন এমন নয়। কারণ সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীর কারণে এ ধরনের উদ্যোগে বাধার মুখে পড়তে পারেন তারা।

২০১৭ সালে মডেল কাইলি জেনার ও গায়িকা কাইলি মিনোগের মধ্যে নামের ট্রেডমার্ক মালিকানা নিয়ে লড়াই হয়। যুক্তরাষ্ট্রে কাইলি জেনারই প্রথম নিজের নামের ওপর একটি ট্রেডমার্কের জন্য আবেদন করেছিলেন। তখন কাইলি মিনোগের পক্ষ থেকে এ পদক্ষেপের বিরোধিতা করা হয়েছিল। মিনোগের পক্ষে আইনি দাবি ছিল, কাইলি নামের ট্রেডমার্ক করার কারণে অস্ট্রেলিয়ান এ গায়িকার ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষতি হতে পারে। ট্রেডমার্কের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রতিরোধের মুখে পড়েন খেলোয়াড় উসাইন বোল্ট, নেইমার জুনিয়র ও নায়িকা প্যারিস হিলটনসহ অনেকে।

শুধু পাবলিক ফিগার বা সেলিব্রিটি নন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ট্রেডমার্কের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে বলে সম্প্রতি জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অফিস (ইইউআইপিও)। সংস্থাটি জানায়, চলতি বছরে ট্রেডমার্কের জন্য বিপুল পরিমাণ আবেদন পাওয়া গেছে। ইইউআইপিও ২০২৩ সালে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৬৯৪টি ট্রেডমার্কের অনুরোধ পেয়েছিল। এর মধ্যে ১ লাখ ৬১ হাজার ২১৬টি ট্রেডমার্ক নিবন্ধিত হয়েছিল। অর্থাৎ আবেদনকারীদের সাফল্যের হার ৯১ শতাংশ।