নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে গত সোমবার বিকাল থেকে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সব ধরনের পণ্য আমদানি-রফতানি বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। ফলে বন্দরের বাংলাদেশ অংশ এবং ভারতের পেট্রাপোল বন্দরে পণ্যবাহী ট্রাকের দীর্ঘ জট তৈরি হয়েছে। এর আগে কোটা সংস্কার আন্দোলনের জেরে কয়েকদিন বন্ধ থাকার পর গত সোমবার সকাল থেকে দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রফতানি শুরু হয়। তবে এদিন দুপুরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে নিরাপত্তার অভাবে বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

বেনাপোল ক্লিয়ারিং এজেন্ট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুর রহমান জানান, গত সোমবার বেলা ৩টা থেকে বেনাপোল বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রফতানি বন্ধ রয়েছে। এদিন সকালে ১৫৬টি গাড়ি পণ্য নিয়ে পেট্রাপোল থেকে বেনাপোলে প্রবেশ করে। তবে গত মঙ্গলবার কোনো পণ্য আসেনি। 

পরিস্থিতি শান্ত হলে আলোচনার মাধ্যমে আমদানি-রফতানির কাজ শুরু করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বেনাপোল বন্দরে শ্রমিকরা না থাকায় কোনো কাজ করা যায়নি। বন্দরে নতুন শ্রমিক যোগদান করলেই কাজ শুরু হবে। আমরা সবাই কাজ করার জন্য প্রস্তুত রয়েছি।’

ওপারের পেট্রাপোল ক্লিয়ারিং এজেন্ট স্টাফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কার্ত্তিক চক্রবর্তী বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর বেনাপোল বন্দর এলাকায় শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে আনন্দ মিছিল করেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে অনেকে পণ্য আমদানি করছেন না। এতে করে পেট্রাপোলে প্রায় দুই হাজার ট্রাক অপেক্ষা করছে বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য।’

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সুলতান মাহমুদ বিপু দাবি করেন, সরকার পরিবর্তন হওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে ভারতীয় ট্রাকচালকরা পণ্য নিয়ে বাংলাদেশে আসতে চাইছেন না। আবার দেশের ব্যবসায়ীরাও সড়কে নিরাপত্তার অভাব বোধ করায় বন্দর থেকে পণ্য ছাড় করছেন না। যে কারণে পেট্রাপোল ও বেনাপোল বন্দরে পণ্যবাহী কয়েক হাজার ট্রাক দাঁড়িয়ে রয়েছে। 

বেনাপোল কাস্টমস সূত্র জানায়, এ বন্দর দিয়ে প্রতি বছর প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা মূল্যের বিভিন্ন পণ্য ভারতে রফতানি হয়। আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে সরকার অনুমোদিত ২৩টি স্থলবন্দরের মধ্যে চলমান ১২টি বন্দরের অন্যতম বেনাপোল। এ বন্দর থেকে ভারতের কলকাতা শহরের দূরত্ব ৮৪ কিলোমিটার। মাত্র ৩ ঘণ্টায় পণ্যবাহী একটি ট্রাক আমদানি পণ্য নিয়ে কলকাতা শহরে পৌঁছাতে পারে। তেমনি একই সময়ে কলকাতা থেকে পণ্যবাহী ট্রাক পৌঁছায় বেনাপোল বন্দরে। যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় এ পথে ব্যবসায়ীদের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। প্রতি বছর এ বন্দর দিয়ে প্রায় ৮০ হাজার টন পণ্য আমদানি করা হয়, যা থেকে সরকারের প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা এবং রফতানি বাণিজ্য থেকে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হয়। প্রতি বছর ৬০ হাজার কোটি টাকার পণ্য এ স্থলবন্দরের মাধ্যমে আমদানি-রফতানি হয়ে থাকে। সরাসরি প্রায় ২০ হাজার মানুষ এবং পরোক্ষভাবে ৫০ হাজার মানুষ বেনাপোল স্থলবন্দরের ওপর নির্ভরশীল।

আমদানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে গার্মেন্টস সামগ্রী, তৈরি পোশাক, শিল্প-কারখানা ও ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মূলধনি যন্ত্রপাতি, কেমিক্যাল, খাদ্যদ্রব্য, চাল, পেঁয়াজ, তুলা, বাস-ট্রাকের চেসিস, মোটরসাইকেল, পার্টস ও টায়ার রয়েছে। রফতানি পণ্যের মধ্যে পাট ও পাটজাত দ্রব্য, টিস্যু, ধানের কুঁড়া, সাদা মাছ, ব্যাটারি, সিরামিক টাইলস, সাবান, হাড়ের গুঁড়া, ওভেন গার্মেন্টস, নিটেড গার্মেন্টস, নিটেড ফ্যাব্রিকস উল্লেখযোগ্য।

বেনাপোল বন্দরের পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, ‘বাণিজ্য সুবিধা স্বাভাবিক রাখার জন্য গতকালও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে অনেকে পণ্য ছাড় করছেন না।’

তিনি আরো জানান, ভারতে প্রবেশের জন্য বন্দরে পণ্যবাহী আড়াই শতাধিক ট্রাক দাঁড়িয়ে রয়েছে। আবার পেট্রাপোল বন্দরেও বেশকিছু ট্রাক অপেক্ষা করছে বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য। 

বেনাপোল কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার সাফায়েত হোসেন বলেন, ‘আমরা বেনাপোল বন্দর থেকে পণ্য ছাড় করতে সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধিদের তাগাদা দিয়েছি। অনেকে বলছেন, নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যবসায়ীরা পণ্য নিতে চাচ্ছেন না। সড়কে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ফিরলে তারা পণ্য ছাড় করবেন। আশা করছি বৃহস্পতিবার থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’