বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই গত বছর নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। তবে ব্যবহারের বড় অংশই দখলে রেখেছে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো। সে তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে। বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার জোর দেয়া হলেও উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে পার্থক্য আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। খবর দ্য ন্যাশনাল নিউজ।

ইন্টারন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি এজেন্সি (আইআরইএ) জানিয়েছে, ২০২২ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা বেড়েছে ২৯৫ গিগাওয়াট। ২০২১ সালের তুলনায় বেড়েছে ১০ শতাংশ। সেখানে চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের দখলেই সর্বাধিক। বর্ধিত সক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশে জুড়ে রয়েছে দেশগুলো। স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে তাল মেলাতে পারছে না। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও অনুকূল পরিবেশের অভাব এখনো প্রকট। আইআরইএর পরিচালক ফ্রান্সিসকো লা ক্যামেরা বলেন, ‘‌নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিয়ে নতুন করে কিছু প্রমাণ করার নেই। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধির প্রধান কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা, জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যে অস্থিতিশীলতা ও জলবায়ু সমস্যা। কিন্তু এটাও আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে এর মধ্য দিয়ে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে পার্থক্য বাড়ছে।’

২০২২ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু উৎপাদিত নবায়নযোগ্য জ্বালানির ৮৫ শতাংশ ব্যবহার করেছে ৫০ শতাংশেরও কম মানুষ। চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রে সৌরবিদ্যুৎ এবং বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প বাড়লেও এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকা অঞ্চলে এখনো পিছিয়ে। এর মধ্য দিয়েই পার্থক্য ফুটে ওঠে। লা ক্যামেরা দাবি করেন, বিদ্যমান এ পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। জ্বালানি খাতের উন্নয়নে ও বিদ্যমান বৈষম্য নিরসনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ দরকার।

ইউরোপিয়ান ব্যাংক ফর রিকনস্ট্রা=কশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ বিয়াটা জ্যাভোরিক বলেন, ‘‌জলবায়ু খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক টানাপড়েন প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। রয়েছে সরকারি পদক্ষেপের অভাব। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা অতিক্রম করা সক্ষম হয়ে উঠছে না সব ক্ষেত্রে। কিছু ক্ষেত্রে আবার বিনিয়োগ প্রত্যাশিত থাকলেও তার প্রয়োগ যথাযথ হচ্ছে না।’

এ ঘোষণা এল সংযুক্ত আরব আমিরাতে কপ২৮ জলবায়ু সম্মেলনের ঠিক আগে। এর মধ্যে আবুধাবির নবায়নযোগ্য জ্বালানি কোম্পানি মাসদার বিশ্বব্যাপী ৪০টিরও বেশি দেশে সক্রিয় এবং ৩ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের প্রকল্পগুলোয় বিনিয়োগ করেছে বা বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কমপক্ষে ১০০ গিগাওয়াট ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য স্থির করেছে।

ইন্দোনেশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ। দেশটি ‘‌ফার্স্ট প্রজেক্ট’ চালু করেছে কপ২৮-কে সামনে রেখে। দেশটি প্রত্যাশিত সীমার আগেই কয়লা বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে চায়। ইন্দোনেশিয়ার নবায়নযোগ্য জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইয়ুদো প্রিয়াদি বলন, ‘‌বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে। কয়লার ব্যবহার আরো আগেই কমিয়ে ফেলা হবে। কয়লা শিল্পের অর্থায়নে প্রধান ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের বিবেচনাই পরিবেশ অনুকূল জ্বালানি গ্রহণ করতে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে। ইন্দোনেশিয়া ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষ হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। কয়লা ব্যবহার থেকে সরে যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রদেশে মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের বেশি মানুষ খাতটিতে কাজ করছে। ফলে ইন্দোনেশিয়ার এ পদক্ষেপে প্রভাব পড়বে সামাজিকভাবেই।

পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জি জানিয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ব্রিকস ৮০ শতাংশের বেশি জ্বালানি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সংগ্রহ করতে পারবে। সেক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও অনুকূল পরিবেশ দিতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলো সম্পদ ও সাশ্রয়ী শ্রম সুবিধাকে কাজে লাগাতে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবেলায়।