ইউরোপজুড়ে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে পেনশন নিয়ে আলোচনা ও উদ্বেগ। কারণ এ অঞ্চলের দেশগুলোয় পেনশন ব্যবস্থা এখন রাজনীতি ও অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। অনেক দেশে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে, আবার কোথাও অবসরপ্রাপ্তদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠছে। ইউরোপে পেনশনের পরিমাণ দেশভেদে ভিন্ন। কোথাও অবসরজীবীরা স্বচ্ছল জীবন কাটান, আবার কোথাও তাদের দৈনন্দিন খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। খবর ইউরো নিউজ।
ইউরোপে প্রবীণদের আয়ের প্রধান উৎস হলো পেনশন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোয় ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের মোট আয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসে রাষ্ট্রীয় ভাতা ও পেনশন থেকে। তবে এত সহায়তা থাকা সত্ত্বেও ইউরোপজুড়ে প্রবীণদের গড় আয় সামগ্রিক জনসংখ্যার গড় আয়ের মাত্র ৮৬ শতাংশ।
অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) জানিয়েছে, বাল্টিক দেশগুলোয় এ অনুপাত ৭০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। এমনকি বেলজিয়াম, ডেনমার্ক ও সুইজারল্যান্ডের মতো বড় অর্থনীতির দেশে পেনশনভোগীদের গড় আয় সাধারণ মানুষের তুলনায় ৮০ শতাংশেরও কম।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ইইউ-ভুক্ত দেশে গড় বার্ষিক মোট পেনশন ছিল প্রায় ২০ হাজার ৩২৪ ডলার (১৭ হাজার ৩২১ ইউরো), যা মাসে প্রায় ১ হাজার ৬৯৩ ডলারের (প্রায় ১ হাজার ৪৪৩ ইউরো) সমান। তবে এ গড় হিসাবের আড়ালে রয়েছে বড় ধরনের বৈষম্য।
ইউরোপের ৩৪টি দেশের মধ্যে বার্ষিক পেনশনের পরিমাণ সবচেয়ে কম তুরস্কে, মাত্র ৩ হাজার ৩৭৭ ইউরো। অন্যদিকে আইসল্যান্ডে অবসরপ্রাপ্তরা বছরে গড়ে ৩৮ হাজার ৩১ ইউরো পান।
ইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বুলগেরিয়ায় গড় পেনশন সবচেয়ে কম, বছরে ৪ হাজার ৪৭৯ ইউরো। তালিকার শীর্ষে রয়েছে লুক্সেমবার্গ, যেখানে গড় পেনশন ৩৪ হাজার ৪১৩ ইউরো। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, সার্বিয়া, মন্টেনেগ্রো, ক্রোয়েশিয়া, স্লোভাকিয়া, রোমানিয়া, লিথুয়ানিয়া, হাঙ্গেরি ও লাটভিয়ায় গড় পেনশন বছরে ৮ হাজার ইউরোরও কম। সব মিলিয়ে ইউরোপে সবচেয়ে বেশি ও সবচেয়ে কম পেনশনের মধ্যে পার্থক্য ১০ গুণের মতো।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর নোয়েল হোয়াইটসাইড বলেন, ‘ইউরোপের সব দেশ সমান ধনী নয়। কিছু অঞ্চলের মানুষ তুলনামূলক অসচ্ছল হওয়ায় সেখানে প্রবীণদের পেনশনের টাকা দিয়ে জীবন চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সে অভাব মেটাতে পরিবারের সন্তানদের বা আত্মীয়স্বজনদের এগিয়ে আসতে হয় এবং আর্থিক সাহায্য করতে হয়।’
জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের মতো ইইউর চারটি বড় অর্থনীতি গড় পেনশনের দিক থেকে ইইউ গড়ের সামান্য ওপরে অবস্থান করছে। এদের মধ্যে ইতালিতে পেনশন সবচেয়ে বেশি। এছাড়া নর্ডিক অঞ্চলের পাঁচটি দেশেই পেনশন ইইউ গড়ের চেয়ে বেশি।
তবে পেনশন তুলনা করা সবসময় সহজ নয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পেনশন ব্যবস্থা ভিন্ন। কোথাও রাষ্ট্রীয় পেনশন প্রধান, কোথাও আবার চাকরিভিত্তিক বা বেসরকারি স্কিম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কাঠামোগত এমন পার্থক্যই দেশভেদে পেনশনের বড় ব্যবধান তৈরি করে।
পেনশন ছাড়াও বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা অবসরপ্রাপ্তদের জীবনমান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মনে করা হয়। ইউরোপের অনেক দেশে পেনশনের পরিমাণ শেষ কর্মজীবনের আয়ের অর্ধেকের কম, ফলে বয়স্কদের দারিদ্র্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এখানে।









