বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থতায় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অনেকটা অকার্যকর সংস্থায় পরিণত হয়েছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)। অবাধ ও মুক্ত বাণিজ্যের রক্ষক ও পাহারাদার হিসেবে শিগগিরই যদি ডব্লিউটিও না দাঁড়ায় তাহলে একসময় প্রাসঙ্গিকতা হারাবে কি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাটি? গতকাল শুরু হওয়া ১২তম সম্মেলনে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। খবর এপি।
করোনা মহামারীর কারণে সম্মেলন আয়োজন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় সাড়ে চার বছর পর একটি সম্মেলনে বসতে যাচ্ছে সদস্য রাষ্ট্রগুলো। ১২-১৫ জুন,
জেনেভায় অনুষ্ঠিত চারদিনের এ সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকদের আলোচ্যসূচিতে থাকবে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রে অতিরিক্ত মাছ আহরণ, উন্নয়নশীল বিশ্বে কভিড-১৯ ভ্যাকসিন সরবরাহ ও ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের মধ্যে খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা।
ডব্লিউটিওর স্ট্যাটাস ক্যু নিয়ে সম্প্রতি সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করেন সংস্থাটির মহাপরিচালক এনগজি ওকঞ্জো-আইওয়েলা। ১৫ মাস আগে দায়িত্ব গ্রহণ করা এ কূটনীতিক বলেন, চারটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর মধ্যে অন্তত একটি ইস্যু সম্মেলনে গুরুত্ব পাবে এমন আশা করেন তিনি।
ডব্লিউটিওর মুখপাত্র ফের্নান্দো পিউচল বলেন, মৎস্য খাতে ভর্তুকি, কৃষি, মহামারী নিয়ন্ত্রণে নেয়া পদক্ষেপ ও সংস্থাটির সংস্কার থাকবে প্রধান চারটি এজেন্ডা। সদস্য দেশগুলোর কূটনীতিক দল ঘণ্টার পর ঘণ্টা এ বিষয় নিয়ে হোমওয়ার্ক করে যাচ্ছে। সম্মেলনের পরিণতি কী হবে তা এ মুহূর্তে পূর্বাভাস দেয়া কঠিন বলে মনে করেন পিউচল।
বিভিন্ন দেশের মধ্যে নিরাপদ ও ন্যায্য বাণিজ্য নিশ্চিত এবং বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তিতে ১৯৯৫ সালে যাত্রা হয়েছিল সংস্থাটির। বর্তমানে জেনিভাভিত্তিক সংস্থাটির সদস্য দেশের সংখ্যা ১৬৪।
সমালোচকরা বলছে, ডব্লিউটিওর সম্মেলন থেকে বেশি কিছু আশা করা যাচ্ছে না। বড়জোর বিভিন্ন দেশের মন্ত্রীর এক টেবিলে বসা হবে।
ডব্লিউটিওর কৃষি বিভাগের সাবেক প্রধান ও বর্তমানে স্বাধীন এক বাণিজ্য নীতি বিশ্লেষক ক্লিমেন্স বুনক্যাম্প বলেন, বহুজাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা খুবই খারাপ অবস্থার মধ্যে রয়েছে। ইউক্রেন পরিস্থিতিতে তা লেজেগোবরে অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। তবে সদস্য দেশগুলো যে একসঙ্গে বসছে এটাই এ ব্যবস্থার প্রতি সম্মানের নিদর্শন।
উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর কূটনীতিক লড়াইয়ের রঙ্গমঞ্চে দাঁড়িয়েছে ডব্লিউটিও। কোনো লক্ষ্য পূরণ করতে চাইলে সংস্থাটির অনেক সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করেন কিছু বিশেষজ্ঞ।
১৯৪৭ সালে চালু হওয়া জেনারেল অ্যাগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেডের (জিএটিটি) উত্তরসূরি হিসেবে ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি যাত্রা ডব্লিউটিওর। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এর নীতি ও কর্মসূচিতে শৈথিল্য দেখা যাচ্ছে। কয়েক বছরের মধ্যে বড় কোনো বাণিজ্য চুক্তির মধ্যস্থতা করতে পারেনি তারা। সর্বশেষ বড় সফলতা ছিল নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তার জন্য ২০১৪ সালের একটি চুক্তি। কিন্তু আমলাতন্ত্রের লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে ওই চুক্তিতেও কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ডব্লিউটিওর আপিল আদালতের ক্ষমতার খড়্গ চালায়। অতীতে যেকোনো বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তিতে শেষ কথা ছিল এ আদালতের। কিন্তু এয়ারবাস ও বোয়িংয়ের মামলা নিষ্পত্তিতে ব্যর্থতার চরম উদাহরণ স্থাপন করে ডব্লিউটিও। তখন থেকেই অনেকটা নখদন্তবিহীন বাঘ হিসেবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন ডব্লিউটিওর আপিল আদালত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ডব্লিউটিও অন্যায্য ব্যবহার করছে এ অভিযোগ তুলে সংস্থাটি থেকে বেরিয়ে আসার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। মিত্রদের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানো কিংবা শত্রুদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে ডব্লিউটিওর নীতিমালার প্রতি সম্পূর্ণ অবজ্ঞা প্রদর্শন করে সংস্থাটির ভূমিকাকে গুরুত্বহীন করে তুলেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা উইলিয়াম রেইনশ বলেন, ডব্লিউটিও এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে। সংস্থাটি যে এখনো গুরত্বপূর্ণ তা নিশ্চিত করার সর্বোত্তম উপায় হলো কোনো একটি চুক্তিতে পৌঁছানো। এগুলো হতে পারে মৎস্যসম্পদ, কভিড-১৯ ভ্যাকসিন কিংবা কৃষিতে মুক্ত বাণিজ্যের মতো কঠিন কোনো ইস্যু।










