নীল চাষ ঔপনিবেশিক বাংলা তথা ভারতের গর্ব ও দ্রোহের ইতিহাস। একসময় ইউরোপীয় শিল্প বিপ্লবের চালিকাশক্তি ছিল ভারতীয় নীল। তবে সময়ের সাথে সাথে আবেদন হারায় তা। প্রজন্মান্তরে নীলের সে হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসছে মাদ্রাজে। বণিক বার্তায় তিন পর্বে নীলের ঐতিহ্য, বিদ্রোহকাল ও বর্তমান অগ্রযাত্রার সলুক সন্ধান করেছেন সৈয়দ রাইয়ান আমীর

নীল বিদ্রোহের স্থান-কাল-পাত্র নিয়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা হলেও এর রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা খুব বেশি বাংলায় অন্তত নেই। নীলের বাণিজ্যিক গুরুত্ব যে কী বিস্তর, তা আলোচনায় আনলে নীলকেন্দ্রিক উত্পীড়ন ও পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের অনিবার্যতা বেশ পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কেননা বলা হয়, ওই সময় ইউরোপীয় বস্ত্র শিল্পকে রাঙাতে মূল ভূমিকা রেখেছিলেন ভারত তথা বাংলার নীলচাষীরা। এতে একদিকে যেমন রয়েছে গর্বের ইতিহাস, তেমনি রয়েছে শোষণ ও বঞ্চনার নানা গল্প।

সবচেয়ে পুরনো রঙগুলোর একটি নীল বা ইন্ডিগো। এটি প্রাচীন মিসর ও এশিয়ার মানুষ চার হাজার বছরের বেশি সময় ধরে উৎপাদন ও ব্যবহার করে আসছে। এমনকি দ্বাদশ শতাব্দীর একজন রোমান ইতিহাসবিদ প্লিনি দা এল্ডার মনে করতেন, ভারতীয় উপমহাদেশের এ পণ্য বেশ চমকপ্রদ ও স্বতন্ত্র।


ক্রান্তীয় উদ্ভিদ হওয়ায় নীল বা ইন্ডিগো উৎপাদনে পর্যাপ্ত বৃষ্টির পানি প্রয়োজন হয়। তবে মাত্রাতিরিক্ত পানি উদ্ভিদটির জন্য ক্ষতিকর। আর ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুগত কারণে নীল উৎপাদনের কথা এলে বাংলার গুরুত্ব সামনে চলে আসে। ভালো মানের নীল উৎপাদন হওয়ায় ব্রিটিশ শাসনামলে নীল চাষের জন্য উপমহাদেশ ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও অনেক ইউরোপীয় ব্যবসায়ী ভারত থেকে ইউরোপে বিপুল পরিমাণ নীল রফতানি শুরু করেন। বাংলায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক বিজয় ১৭৭০ সালে নীল উৎপাদনকারী ট্রান্সআটলান্টিক উপনিবেশে সমস্যা এবং ইউরোপে বস্ত্র উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে নীলের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় কোম্পানি সরকার বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে নীল উৎপাদনে অধিক গুরুত্বারোপ করে। এর উৎপাদন বৃদ্ধি ঘটে ১৭৯০-এর দশকে এবং ভারত (বিশেষত বাংলা) এ কাঁচামালের বৃহত্তম সরবরাহকারী হয়ে ওঠে।

ব্রিটেনে ওই সময়টায় শিল্প বিপ্লবের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। ফুলেফেঁপে উঠছে দেশটির বস্ত্র শিল্প। শিল্পের বিকাশে প্রয়োজন প্রচুর নীল। কাজেই নীলের বাজার নিয়ে ভাবতে হয়নি ভারতীয়দের। বরং ব্রিটিশরাই নিজেদের প্রয়োজনে এখান থেকে নীল নিজ দেশে নিয়ে গেছে। ১৭৮২-৮৬ সালের মধ্যে ভারত থেকে ব্রিটেনে নীল রফতানির আর্থিক মূল্য ছিল বছরে দেড় লাখ পাউন্ড। ১৭৯২-৯৬ সাল নাগাদ তা বেড়ে বছরে ২০ লাখ পাউন্ডে উন্নীত হয়। আঠারো শতকের প্রথম দশকে (১৮০১-১০ সাল) তা আরো বেড়ে বার্ষিক ৩০ লাখ পাউন্ড অতিক্রম করে। ১৮৪০ সাল নাগাদ ভারত থেকে ব্রিটেনে নীল রফতানির আর্থিক মূল্য ৮০ লাখ পাউন্ড ছাড়িয়ে যায়।


ভারত থেকে ব্রিটেন, ইউরোপ ও আমেরিকার অন্যান্য অংশে নীল রফতানি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৮৩০-এর পর ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রে নীল রফতানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ে। শতকের শেষভাগে এসে কৃত্রিম নীলের জনপ্রিয়তা প্রাকৃতিক নীল চাষকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করে। যদিও ইতিহাসবিদদের মতে, নীল বিদ্রোহের ধারাবাহিকতায় ব্রিটিশদের ভারতীয় নীলের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করেছিল। এর সত্যতা থাকলেও ইউরোপের বাজারে কৃত্রিম নীল ততদিনে অবস্থান পোক্ত করেছে। ভারতে ঔপনিবেশিক প্রশাসন, নীলচাষী এবং রসায়ন ও উদ্ভিদবিদদের যৌথ প্রচেষ্টায় নতুন জাতের (জাভা নীল) প্রবর্তন করা হয়। চালু হয় উৎপাদনের নতুন পদ্ধতি। এর পরও রফতানিমুখী প্রাকৃতিক নীল শিল্প আরো প্রান্তিক অবস্থানে পৌঁছে যায়।

১৯১০-এর দশকের শেষের দিকে এবং ১৯২০-এর দশকের শুরুতে নীল বাণিজ্য চালু ছিল যুক্তরাষ্ট্র, মিসর ও ব্রিটেনের সঙ্গে। ১৯২০-এর দশকের শেষের দিকে ভারতে বাণিজ্যিক নীল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ততদিনে কৃত্রিম নীল ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রাকৃতিক পণ্যটির ভালো ও তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল বিকল্প হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।

বাংলার বাইরে মাদ্রাজ (বর্তমান চেন্নাই নামে পরিচিত) ইন্ডিগোর উল্লেখযোগ্য উৎস ছিল। ১৮৩০-এ শুধু মাদ্রাজ থেকে ব্রিটেনে ১০ লাখ পাউন্ডের বেশি মূল্যের নীল রফতানি হয়েছিল। যদিও বলা হয়, মাদ্রাজের নীলের চেয়ে বাংলার নীলের মান বেশ ভালো। জন ফিপসের মতে, মাদ্রাজের নীল নিম্নমানের। সাধারণত খুব কম দামে তা ইউরোপে বিক্রি হত। শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলায় বিদ্রোহের ফলে মাদ্রাজি নীলের রফতানি চাহিদা চাঙ্গা হয়। ওই সময় ব্রিটেনে রফতানি হওয়া নীলের ৩১ শতাংশ ছিল মাদ্রাজি, রফতানি আয়ের যা ২১ শতাংশ।

এছাড়া বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) থেকে ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ায় নীল রফতানি করা হতো। এটি যদিও উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র ছিল না। বরং এ নীল ছিল সিন্ধু, গুজরাট, বাংলা, এমনকি ম্যানিলা ইন্ডিগোর মিশ্রণ। কিছু নীল লন্ডনে পাঠানো হতো এবং মাঝে মাঝে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হতো। শতাব্দীর একেবারে শেষভাগে ব্রিটেনে রফতানি কিছুটা বৃদ্ধি পায়। ব্রিটেন মাঝে মাঝে সিলন থেকে নীল আমদানি করত, যদিও তা পরিমাণে ছিল খুবই অল্প।

ব্রিটেনের পর ফ্রান্স ছিল ভারতীয় নীলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাজার। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে ফ্রান্সের প্রধান নীল উৎপাদনকারী উপনিবেশ সেন্ট ডোমিঙ্গ হারানোর পর সম্প্রসারিত ফরাসি বস্ত্র শিল্প ভারত থেকে আমদানি করা নীলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ১৮৪৩-৪৪ ও ১৮৫৭-৫৮ সালে বাংলা থেকে ফ্রান্সে নীল রফতানির গড় বার্ষিক মূল্য ৪০ লাখ রুপি ছাড়িয়ে যায়, যা নীল রফতানির মোট আর্থিক মূল্যের ২২ দশমিক ৩ শতাংশ। দক্ষিণ-পূর্ব ভারত প্রধানত তার উপনিবেশ পণ্ডিচেরি থেকে নীল নিয়ে যেত ফ্রান্স। এছাড়া মাদ্রাজ নীল ওই সময় ফ্রান্সে যায়। তবে বাংলা থেকে ফ্রান্সে নীল রফতানির খুব একটা তথ্য মেলে না। ইউরোপের বাইরে মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ছাড়াও পূর্ব ইউরোপে ভারতীয় তথা বাংলা ও মাদ্রাজের নীলের কদর ছিল।

 

ছবি: গুটেনবার্গডটওআরজি