বিপুল ওজনের একটি রকেটকে মহাকাশের দিকে উৎক্ষেপণের কাজে ব্যবহার হয় রকেট বুস্টার। উৎক্ষেপণের সময় রকেটের নিজস্ব শক্তির পাশাপাশি অতিরিক্ত ধাক্কা বা থ্রাস্টের মাধ্যমে এতে বাড়তি গতি দেয়ার কাজে এ বুস্টার ব্যবহার করা হয়। সাধারণত কোনো রকেট বুস্টার একবারের বেশি ব্যবহার হয় না। তবে বর্তমানে ইলোন মাস্কের কোম্পানি স্পেসএক্স রকেট বুস্টারগুলোকে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে সক্ষম হয়েছে। একই লক্ষ্য থেকে উৎক্ষেপিত রকেটের বুস্টার পুনরুদ্ধার ও তা পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলার প্রয়াস নিয়েছে চীনা বেসরকারি রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ল্যান্ডস্পেসও। খবর রয়টার্স।
প্রতিষ্ঠানটির একজন শীর্ষ প্রকৌশলী এ কথা জানিয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে বোঝা যাচ্ছে যে রকেট উৎক্ষেপণের খরচ কমানো ও বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেই মনোযোগ দিয়েছে কোম্পানিটি। এ কাজে অগ্রণী ধরা হয় যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি স্পেসএক্সকে। এমন পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে ল্যান্ডস্পেস স্পেসএক্সের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে যাচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
মহাকাশে রকেট উৎক্ষেপণের খরচের বড় অংশ কমাতে ভূমিকা রাখে রকেট উৎক্ষেপণের পর ইঞ্জিন-সংবলিত প্রথম ধাপ বা বুস্টার উদ্ধার করা, নিরাপদে ফিরিয়ে আনা ও তা আবার ব্যবহার করা। একই সঙ্গে এটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ সহজ করে এবং মহাকাশ খাতকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করে তোলে। অনেকটা বেসামরিক উড়োজাহাজ শিল্পের মতো নিয়মিত ও কম খরচে পরিষেবা দেয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
চলতি মাসের শুরুতে চীনে প্রথমবারের মতো পূর্ণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য বুস্টার নিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছে ল্যান্ডস্পেস। কোম্পানিটির তৈরি ঝুকু-৩ রকেট উত্তর-পশ্চিম চীনের একটি দুর্গম এলাকা থেকে প্রথম উড্ডয়ন করে। এটি ছিল রকেটটির প্রথম ফ্লাইট। যদিও উৎক্ষেপণ সফল হয়, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অবতরণ ও বুস্টার উদ্ধার পর্যায় সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
তবে কোম্পানিটি আশা করছে, দ্বিতীয় পরীক্ষায় সে বাধা কাটিয়ে উঠতে পারবে। ঝুকু-৩ প্রকল্পের উপপ্রধান নকশাবিদ ডং কাই এক চীনা প্রযুক্তি পডকাস্টে বলেন, ‘২০২৬ সালের মাঝামাঝি দ্বিতীয় পরীক্ষামূলক ফ্লাইটে রকেট পুনরুদ্ধার সফল করার লক্ষ্য রয়েছে তাদের। যদি দ্বিতীয় ফ্লাইটের উদ্ধার ধাপ সফল হয়, তাহলে চতুর্থ ফ্লাইটে আমরা পুনর্ব্যবহৃত প্রথম ধাপ ব্যবহার করে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করছি।’
এখন পর্যন্ত পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তিতে সবচেয়ে বড় সাফল্য দেখিয়েছে স্পেসএক্স। প্রতিষ্ঠানটির ফ্যালকন ৯ রকেট বছরে প্রায় ১৫০ বার উৎক্ষেপণ করা হয়। প্রয়োজন হলে একটি বুস্টার বহুবার পুনর্ব্যবহার করা হয়।
স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলোন মাস্ক অক্টোবরে বলেন, ‘ল্যান্ডস্পেসের ঝুকু-৩ রকেটের নকশা তাত্ত্বিকভাবে ফ্যালকন ৯-এর চেয়েও উন্নত হতে পারে। বছরে রকেট উৎক্ষেপণের সংখ্যার দিক থেকে স্পেসএক্সের বর্তমান সক্ষমতায় পৌঁছতে চীনা কোম্পানিটির পাঁচ বছরেরও বেশি সময় লাগবে। ওই সময়ের মধ্যে স্পেসএক্স ফ্যালকন ৯-এর বাইরে নতুন প্রজন্মের ভারী রকেট স্টারশিপ ব্যবহারে জোর দেবে। এতে বছরে কক্ষপথে বহনক্ষমতা ফ্যালকন ৯-এর তুলনায় বহু গুণ বেড়ে যাবে।’
ডং কাইও এ বাস্তবতা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে ফ্যালকন ৯-এর উৎক্ষেপণ হারকে ছাড়িয়ে যাওয়া কঠিন। কারণ চীনে চলতি বছর সব মিলিয়ে রকেট উৎক্ষেপণ হয়েছে প্রায় ১০০টি। একটি কোম্পানির পক্ষে এত বেশি সংখ্যায় উৎক্ষেপণ পরিচালনা সহজ নয়। এজন্য পুরো একটি শিল্প ইকোসিস্টেমের সহায়তা প্রয়োজন।’ আগামী বছর সব মডেল মিলিয়ে ১০টি উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করছে ল্যান্ডস্পেস।
উচ্চ ঘনত্বে পরীক্ষা ও উৎক্ষেপণ চালাতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। ল্যান্ডস্পেসের অন্যান্য কর্মকর্তারা আগেই জানিয়েছেন, স্পেসএক্সের সাফল্যের বড় কারণগুলোর একটি হলো ব্যয়ভার বহনের সক্ষমতা। চীনের পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহই হতে পারে ল্যান্ডস্পেসের জন্য একমাত্র বাস্তব পথ। সে কারণেই কোম্পানিটি আগামী বছর প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওতে যাওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ল্যান্ডস্পেস প্রযুক্তিগতভাবে স্পেসএক্সের পথে এগোলেও বাস্তবতা ও সক্ষমতার ব্যবধান এখনো বড়। ২০২৬ সালের পরীক্ষাই ঠিক করে দেবে, চীনের এ কোম্পানি পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেটের দৌড়ে কত দূর যেতে পারবে।









