মিসরের অর্থনীতি গত এক বছরে বড় ধরনের চাপে পড়েছে। দেশটির মুদ্রা পাউন্ডের অবমূল্যায়ন হয়েছে নজিরবিহীন। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ফুরিয়ে আসছে, বাড়ছে রেকর্ড মূল্যস্ফীতি। শিল্পায়নে ব্যর্থতা ও রফতানি নীতি ঠিকমতো কাজ না করায় বাণিজ্য ঘাটতি প্রকট হয়েছে। ফলে গভীর হচ্ছে অর্থনৈতিক সংকট। খবর দ্য ন্যাশনাল নিউজ।

সরকারের পক্ষ থেকে এতদিন কভিড মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে দায়ী করা হচ্ছিল। সাম্প্রতিক মন্দাবস্থার পেছনে হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধকে দায়ী করা হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ সপ্তম সপ্তাহে গড়িয়েছে, যা অনিশ্চয়তা ও ভয়ের জন্ম দিয়েছে অঞ্চলটিতে। আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ মিসরে বর্তমানে প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ মানুষের বসবাস। দেশটির সঙ্গে গাজা ও ইসরায়েল উভয়ের সীমান্ত রয়েছে। গত মাসে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন থেকে মিসর সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করছে। দেশটির বিদেশী ঋণ ১৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলার এবং বার্ষিক আমদানি বিল ৯ হাজার কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ২০২২ সালের মার্চ থেকে দেশটির মুদ্রার বিনিময় হার কমেছে ৫০ শতাংশেরও বেশি। আর মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছে ৪০ শতাংশের কাছাকাছি।

সমালোচকরা বলছেন, অতিরিক্ত ঋণ, অপ্রয়োজনীয় ও ব্যয়বহুল মেগাপ্রকল্প, স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের ওপর অধিক নির্ভরতা এ সংকটের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, চলতি সপ্তাহে কালোবাজারে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ছিল ৫১ পাউন্ড, যা ব্যাংক রেট থেকে ২০ পাউন্ড বেশি।

বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের বিষয়টি মিসরের জন্য ব্যাপক উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, ২০২৪ সালে ঋণ পরিশোধের জন্য দেশটির ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ প্রয়োজন। রিজার্ভ ঘাটতির কারণে বন্দরে আটকে থাকা আমদানির পণ্যের ৫০০ কোটি ডলার বকেয়া পড়ে রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশী কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ফেরত দিতে সমস্যা হচ্ছে।

কায়রোর এক শিল্পপতি জানান, আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরে আটকে থাকা আমদানীকৃত পণ্য খালাস করতে কালোবাজার থেকে তিনি ডলার কিনেছেন। ব্যাংকে অফিশিয়াল রেট প্রযোজ্য হওয়ায় তাকে অনেক টাকা খোয়াতে হয়েছে।

অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দেশটির অন্যতম আয়ের উৎস পর্যটন খাতও কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়েছে। গিজা পিরামিড বা মিসরীয় জাদুঘরের জনপ্রিয় পর্যটন স্থানগুলোয় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বুকিং বাতিল করেছে বিদেশীরা।

সম্প্রতি একজন ট্যুর গাইড জানান, তারা প্রায় ২০ শতাংশ বুকিং বাতিলের মুখোমুখি হয়েছেন।

সংকটের মধ্যেও অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে ভূমিকা রাখছে প্রবাসী আয়, সুয়েজ খাল থেকে প্রাপ্ত অর্থ ও পর্যটন খাতের আয়। দেশটির মোট জিডিপির প্রায় ১৫ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে।

মিসরের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ৩০ জুন শেষ হওয়া আর্থিক বছরে শ্রমঘন খাতটি থেকে রেকর্ড ১ হাজার ৩৬৩ কোটি ডলার আয় হয়েছে, যা এক বছর আগে ছিল ১ হাজার ৭৫ কোটি ডলার।

দেশটির প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা মাদবৌলি গত সপ্তাহে জানান, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি একটি ক্ষণস্থায়ী সংকট, এটি শিগগির কেটে যাবে। যদিও তিনি তার এ আশাবাদের পেছনে কোনো কারণ উল্লেখ করেননি। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণাকে সমালোচকরা ‘‌নিছক কথার কথা’ বলে মন্তব্য করেছেন।

মিসরের অর্থনৈতিক শোচনীয় অবস্থায় উপসাগরীয় দেশগুলো সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবে বলে ধারণা করছেন অনেকে। যদিও দেশগুলোর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি। এর আগে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতারের মতো দেশগুলো মিসরের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে মিসরীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলার আমানত রেখেছে। এছাড়া দেশটির অন্যান্য খাতে আরো ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার ঋণ দিয়ে রেখেছে। এসব প্রণোদনা কোনো কাজে আসছে না।