বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) করপোরেট গভর্ন্যান্স কোডের অধীনে তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে কমপক্ষে একজন নারী স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ করতে হবে। বিএসইসির এ নির্দেশনা মেনে করপোরেট পর্ষদে লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করতে হবে। রাজধানীর সিএ ভবনে গতকাল ‘অগ্রসর অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন-স্বাধীন পরিচালকত্ব’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস (আইসিএবি) ও ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ বৈঠকে উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন নারী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের দ্রুত বর্ধনশীল সংখ্যার ওপর জোর দেয়া হয়।

আইসিএবির সভাপতি এনকেএ মবিনের সভাপতিত্বে অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন আইসিএবির জেন্ডার ইনক্লুশন অ্যান্ড লিডারশিপ কমিটির (জিআইএলসি) চেয়ারম্যান জেরীন মাহমুদ হোসেন।

বৈঠকে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএসইসি কমিশনার ফারজানা লালারুখ জানান, ৩১ ডিসেম্বর বর্ধিত সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ৩৬০টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১৩৮টি এখন পর্যন্ত নারী স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ করেছে। সময়সীমা শেষ হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন বলেও সতর্ক করেন তিনি।

বিএসইসির কমিশনার আরো বলেন, ‘বিএসইসি স্বাধীন নারী পরিচালকদের একটি শক্তিশালী দল তৈরির জন্য কাজ করছে। পর্যাপ্তসংখ্যক যোগ্য প্রার্থী পাওয়া গেলে কিছু নিয়োগের মানদণ্ডে নমনীয়তা বিবেচনা করা হতে পারে।’

এ সময় তিনি বর্ধিত প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন, বিশেষ করে পরিবার-পরিচালিত তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পরিচালকদের জন্য, যারা প্রায়ই দুর্বল সম্মতি কাঠামোর মুখোমুখি হন।

বৈঠকে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান স্বাধীন পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিএসইসির অনুমোদনে বিলম্বের কথা তুলে ধরেন এবং আরো স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রক নমনীয়তার আহ্বান জানান।

এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর জোর দিয়ে বলেন, ‘স্বাধীন পরিচালকরা সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে ও লিঙ্গ বৈচিত্র্য বোর্ডের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে।’ তিনি বিএসইসিকে যোগ্য পেশাদার নিয়োগের সুবিধার্থে নির্দেশিকা সংশোধন করার আহ্বান জানান, যার মধ্যে সহযোগী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, আমলা ও শিক্ষাবিদরাও অন্তর্ভুক্ত।

বৈঠকে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান উল্লেখ করেন, বিএসইসির প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশন প্রায়ই অতিরিক্ত ও এটিকে সহজতর করা উচিত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘সব পরিচালকের জন্য প্রশিক্ষণ অপরিহার্য, কারণ অনেকের মধ্যে এখনো তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই।’

আইসিএবির সভাপতি হোসেন সাদাত রাজনৈতিক বা পারিবারিক সম্পর্কের চেয়ে যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি স্বাধীন পরিচালকদের প্রতিক্রিয়া অর্জনের জন্য অডিট কমিটির মধ্যে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার পরামর্শ দেন। জবাবদিহি জোরদার করার জন্য তিনি এজিএমে স্বাধীন পরিচালকদের বক্তব্য রাখার অনুমতি দেয়ার প্রস্তাবও করেন।

ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আক্তার মালা নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণের জন্য নারীদের, বিশেষ করে নারী সাংবাদিকদের প্রস্তুত করার ওপরে গুরুত্বারোপ করেন।

গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা চৌধুরী বলেন, ‘যারা পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তাদের প্রমাণিত নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষমতা থাকে। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কম হতে পারে, কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। তাই স্বাধীন পরিচালক হওয়ার জন্য তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ সংরক্ষণ করা উচিত।’

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ সদস্য শাহারিয়ার সাদাত বাস্তব জীবনের উদাহরণ তুলে ধরেন, যা প্রমাণ করে যে সুযোগ পেলে নারীরা নেতৃত্বের ক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট হয় ও প্রশিক্ষণ তাদের কার্যকারিতা আরো বৃদ্ধি করে।

আইএফসির ইএসজি অফিসার লোপা রহমান সুশাসনের অন্তর্দৃষ্টি উপস্থাপন করেন। এ সময় তিনি লিঙ্গ-বৈচিত্র্যপূর্ণ বোর্ডগুলোকে শক্তিশালী শাসন ও উন্নত আর্থিক কর্মক্ষমতার সঙ্গে সংযুক্ত করার বিশ্বব্যাপী প্রমাণ তুলে ধরেন।

এ কাসেম অ্যান্ড কোং-এর ব্যবস্থাপনা অংশীদার ও আইসিএবির জিআইএলসি সদস্য সানজিদা কাসেম আইসিএবির সর্বশেষ জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন।

এ সময় তিনি জানান, বর্তমানে নয়টি খাতে ২১ জন নারী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বোর্ডে কর্মরত রয়েছেন। ১৩৪ জন অতিরিক্ত নারী এফসিএ স্বাধীন পরিচালকের ভূমিকার জন্য সম্পূর্ণ রূপে বোর্ড প্রস্তুত। আইসিএবি সদস্যদের ৭৫ শতাংশ নারী স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী, যা শক্তিশালী শিক্ষাগত ও পেশাদার গভীরতা প্রতিফলিত করে।