দুই বছর আগে ভারতকে গ্রিন এনার্জিনির্ভর দেশে পরিণত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সে সময় তিনি ভারতকে শূন্য কার্বন নির্গমনকারী দেশে পরিণত করার অঙ্গীকারও করেছিলেন। ভারতকে গ্রিন এনার্জির অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত করতে মোদির পরিকল্পনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আদানি গ্রুপের কর্ণধার গৌতম আদানি। এ খাতে বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনাও নিয়েছিলেন তিনি। তবে সম্প্রতি গ্রুপটি যে লোকসানের শিকার হয়েছে তা ভারতের গ্রিন এনার্জি কলোসাসে পরিণত হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। খবর বিবিসি।

গৌতম আদানির অধীনে বিস্তৃত পোর্ট টু এনার্জি গ্রুপ, সাতটি ট্রেড প্রতিষ্ঠান ও একটি নবায়নযোগ্য শক্তি প্রতিষ্ঠান আদানি গ্রিন এনার্জি পরিচালিত হয়ে থাকে। গ্রিন এনার্জিতে ৭ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বে নবায়নযোগ্য শক্তির অন্যতম প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছিলেন। হাইব্রিড নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন, ব্যাটারি ও সোলার প্যানেল তৈরিতে এ অর্থ ব্যয় করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। বায়ুবিদ্যুৎ ও গ্রিন হাইড্রোজেন ব্যবহারের মাধ্যমে এসব কাজ সম্পাদন করা হবে। 

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিনডেনবার্গ রিসার্চ আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে কয়েক দশক ধরে স্টকে হস্তক্ষেপ করা ও ভুয়া অ্যাকাউন্ট পরিচালনা সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর পরই গ্রুপটির তালিকাবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো ১২ হাজার কোটি ডলারের বেশি বাজারমূল্য হারায়। এ ঘটনার কারণে অনেকের মনেই শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে এ ঘটনার প্রভাবে গ্রিন এনার্জির অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হতে ভারত সরকার যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে তা ব্যাহত হতে পারে। যদিও হিনডেনবার্গ প্রকাশিত প্রতিবেদনকে আদানি গ্রুপ ভুয়া ও বানোয়াট বলে উড়িয়ে দিয়েছে এবং এটি ভারতের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ বলে জানিয়েছে।

আদানি গ্রুপের এ ঘটনায় বিনিয়োগকারীরাও পেছাতে শুরু করেছে। ফ্রান্সের তেল ও গ্যাস গ্রুপ টোটালএনার্জিস আদানি গ্রুপের সঙ্গে গ্রিন হাইড্রোজেন প্রকল্পে ৪০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ রেখেছে। হিনডেনবার্গের প্রতিবেদন নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে সেটি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত বিনিয়োগ বন্ধ থাকবে। দুটি প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে এখন পর্যন্ত ৩০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। বিনিয়োগকারীদের শান্ত করতে আদানি গ্রুপ জানায়, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি কোনো সংকটের মধ্যে নেই।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে ভারতের উদ্যোগে সম্প্রতি যে ধরনের পরিবর্তন এসেছে সেগুলোর প্রভাব নিয়ে এখনই চিন্তার কোনো কারণ নেই। ইনস্টিটিউট অব এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিটিকসের ভিভুতি গার্গ বলেন, সবুজ শক্তি খাতে আদানি গ্রুপ অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান। সাম্প্রতিক ঘটনার কারণে নতুন বিনিয়োগ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি প্রতিষ্ঠানটি অর্থ জোগাড় করতে না পারে তাহলে গ্রিন এনার্জি খাতে মোট বিনিয়োগের বড় অংশ বাধাগ্রস্ত হবে। তবে নবায়নযোগ্য শক্তির অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে।’

আগামী কয়েক দশকে ভারতে শক্তি সরবরাহ ও ব্যবহার নীতিতে যে পরিবর্তন আসবে তা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঘটনা হবে। ১৪০ কোটির বেশি অধিবাসীর দেশটিতে সরকারকে এখন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এশিয়ার দেশটির শহরে প্রতি বছর লন্ডনের সমপরিমাণ জনসংখ্যা যুক্ত হচ্ছে। এছাড়া শিল্প-কারখানার সংখ্যাও বাড়ছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে হিটওয়েভের মতো বিষয়ও রয়েছে। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারে ঝুঁকলে দেশটিতে বিদ্যুতের চাহিদা আরো বাড়বে।

আদানি গ্রুপ ছাড়া গ্রিন এনার্জিতে অন্য বড় গ্রুপ হলো আম্বানিস। রিলায়েন্স গ্রুপের মুকেশ আম্বানি গুজরাটের পশ্চিমাঞ্চলে নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে ৮ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতের আরেক জায়ান্ট টাটা গ্রুপ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে যোগ দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর পরও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে এখনো বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে এবং এজন্য আরো প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

দিল্লিভিত্তিক থিংকট্যাংক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের অশ্বিনি কে সোয়াইন বলেন, ‘‌ভারতে বিদ্যুতের যে ক্রমবর্ধমান চাহিদা তা পূরণের জন্য আমাদের আরো ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তার মতে, ভারতের অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে গ্রিন এনার্জি খাতে অবদান রাখা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, ‘‌অর্ধডজন বা অনেক বড় এক দুটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে কাজ করা সম্ভব না।’ অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক ক্লাইমেট এনার্জি ফাইন্যান্সের টিম বাকলি বলেন, ‘‌আদানি গ্রুপ বর্তমানে যে সমস্যায় রয়েছে সেটি নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সুবর্ণ সুযোগ।’ 

সামগ্রিকভাবে ভারতের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৪০০ গিগাওয়াট। ২০৩০ সাল নাগাদ দেশটি ৫০০ গিগাওয়াট ক্লিন এনার্জি একাই যুক্ত করতে চাইছে। এটি খুবই সাহসী উদ্যোগ। দেশটি বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে মূলত জ্বালানি তেল ও কয়লার ওপর নির্ভরশীল। এদিক থেকে সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যবস্থা পরিবর্তন খুবই কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।