কভিডজনিত প্রতিবন্ধকতা অব্যাহত রয়েছে। ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের পর বিশ্বজুড়ে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে মূল্যস্ফীতি। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে বিভিন্ন পণ্যের দাম। মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় সুদের হার বাড়াচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। এ অবস্থায় বিশ্বব্যাপী মন্দার ঝুঁকি বাড়ছে। এরই মধ্যে মন্দার আশঙ্কা ভর করেছে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) ওপরও। কেউ কেউ নিশ্চিত, এরই মধ্যে মন্দায় পড়ে গিয়েছে অর্থনীতি। খবর ইয়াহু ফাইন্যান্স।
সম্প্রতি প্রকাশিত ব্যবসায়িক গ্রুপ কনফারেন্স বোর্ডের সমীক্ষা অনুসারে, বিশ্বের বেশির ভাগ প্রধান নির্বাহী ও নির্বাহী পর্যায়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, তাদের ভৌগোলিক অঞ্চল ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ মন্দায় পড়বে। ৬০ শতাংশ সিইও আশঙ্কা করছেন, তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করা অঞ্চলের অর্থনীতি আগামী ১২-১৮ মাসের মধ্যে সংকোচনের মুখোমুখি হবে। প্রায় ১৫ শতাংশ সিইও মনে করছে, তাদের অঞ্চল এরই মধ্যে মন্দায় প্রবেশ করেছে।
ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি কমাতে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো পর্যায়ক্রমে সুদের হার বাড়িয়ে চলেছে। পাশাপাশি আরো আক্রমণাত্মক পরিকল্পনারও ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতেই অর্থনীতি নিয়ে ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে হতাশাবাদী মনোভাব বাড়ছে। সম্প্রতি মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার দশমিক ৭৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশে উন্নীত করেছে। এটি ১৯৯৪ সালের পর সর্বোচ্চ বৃদ্ধি।
এ অবস্থায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। ব্যাংক অব আমেরিকার গ্লোবাল রিসার্চের অর্থনীতিবিদরা চলতি সপ্তাহে মার্কিন প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি ব্যাংকটি আগামী বছর ৪০ শতাংশ মন্দার ঝুঁকি দেখছে। যদিও জেপি মরগানের অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত শীর্ষ ৫০০ প্রতিষ্ঠানের পতন মানে মন্দার ঝুঁকি ৮৫ শতাংশ। চলতি সপ্তাহের শুরুতে বাজারমূল্যের দিক থেকে শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারদর নিম্নমুখী হয়েছে। তবে অনেক মার্কিন সিইও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ফেডারেল রিজার্ভের সর্বশেষ সুদের হার বাড়ানোর আগেও তারা অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা করেছেন।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় জেপি মরগানের সিইও জেমি ডিমন ও টেসলার প্রধান ইলোন মাস্কসহ শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতার অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এমনকি এমন সতর্কতার পর সংস্থাটি ব্যবস্থাও নিয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে বিশ্বের শীর্ষ ধনী মার্কিন অর্থনীতি নিয়ে খুব বাজে অনুভূতির বিষয়টি উল্লেখ করে টেসলার ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাইয়ের ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। ‘পজ অল হায়ারিং ওয়ার্ল্ড ওয়াইড’ শিরোনামের এ বার্তা নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছিলেন তিনি। পৃথক একটি ই-মেইলে তিনি বলেছিলেন, টেসলা বেতনভুক্ত কর্মীর সংখ্যা ১০ শতাংশ কমিয়ে দেবে। কারণ অনেক জায়গায় অতিরিক্ত কর্মী হয়ে গিয়েছে। যদিও ঘণ্টাভিত্তিক কর্মী সংখ্যা বাড়বে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এরই মধ্যে সংস্থাটি নতুন কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি ১৪ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে।
একই সময়ে জেমি ডিমন একটি ব্যবসায়িক সম্মেলনে মন্দার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে বলেন, মার্কিন অর্থনীতিতে হারিকেন শুরু হতে যাচ্ছে। আপনারা নিজেদের আরো শক্তিশালী করুন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় এরই মধ্যে জেপি মরগান প্রস্তুত হয়েছে এবং আমরা আমাদের ব্যালান্স শিট নিয়ে খুব রক্ষণশীল হতে যাচ্ছি।
টেসলার মতো অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও মন্দার আশঙ্কায় নতুন কর্মী নিয়োগ কমিয়ে দিয়েছে এবং কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অর্থনৈতিক মন্দা ও প্রস্তুতির উদ্ধৃতি দিয়ে ক্রিপ্টো লেনদেন প্লাটফর্ম কয়েনবেস চলতি সপ্তাহে ১৮ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করেছে। এ উদ্বেগ রিয়েল এস্টেট খাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। এ খাতের প্রতিষ্ঠান রেডফিন ও কম্পাস কর্মী বাহিনী কমিয়ে এনেছে।
এদিকে এমন পরিস্থিতিতেও অনেক বিশ্লেষক অর্থনীতি নিয়ে এখনো আশাবাদী। সাম্প্রতিক একটি সম্মেলনে মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক মরগান স্ট্যানলির সিইও জেমস গোরম্যান মনে করেন, মন্দা টেবিলে রয়েছে, তবে অনিবার্য নয়। বর্তমান পরিস্থিতি উজ্জ্বল অর্থনীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ আমাদের শক্তিশালী করপোরেট ব্যালান্স শিট, দৃঢ় ভোক্তা চাহিদা এবং কঠিন শ্রমবাজার অর্থনৈতিক পূর্বাভাসকে আরো উজ্জ্বল করছে।










