অর্থনৈতিকভাবে জার্মানি বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। এ কারণে চলতি বছর বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ছিল মন্থরগতির। জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার গোল্ডম্যান স্যাকসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওলফগ্যাং ফিঙ্ক জানান, চলমান পরিস্থিতির সঙ্গে সফলভাবে মানিয়ে নিতে এবং অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য দেশটির অর্থনীতিকে গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। খবর গোল্ডম্যান স্যাকস।

অর্থনৈতিক এ পরিবর্তনের জন্য চীনের সঙ্গে জার্মানির কূটনৈতিক সম্পর্ক অন্যতম বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

যদিও ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যের কারণে বর্তমানে চীন দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। জার্মানির শিল্পোৎপাদন খাতের জন্য চীন গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হিসেবে এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। এ কারণে দেশ দুটির পারস্পরিক নির্ভরশীলতা আরো স্পষ্ট হয়েছে। জার্মান কোম্পানিগুলোর চীননির্ভরতা এ সম্পর্ককে পুনর্মূল্যায়ন করছে। ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ ধরনের নির্ভরতাভিত্তিক সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসতে হবে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

আরেকটি রূপান্তর ক্ষেত্র হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর বা কার্বন নিঃসরণ কমানো। ২০২২ সালে জার্মানিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ার ফলে জার্মান শিল্প-কারখানায় প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার কমেছে। তবে টেকসই জ্বালানি উৎপাদন ও সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো স্থাপনে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

২০৩০ সালের মধ্যে জার্মানি ৬৫ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ কমাতে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৮৮ শতাংশ কামানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরকে সহজ করার জন্য সরকারি প্রচেষ্টাও চলমান রয়েছে। তবে তা বাস্তবায়নে সুশৃঙ্খলতার দরকার রয়েছে বলে অভিমত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিভিন্ন উদ্যোগ বিলম্বিত হচ্ছে বলেও মনে করছেন তারা।

গাড়ি নির্মাণ খাত জার্মানির অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী খাত। জলবায়ুবিষয়ক লক্ষ্য ও বিদ্যুচ্চালিত গাড়িতে স্থানান্তরের জন্য আটোমটিভ খাতটিও নতুন পরিবর্তনের সম্মুখীন হচ্ছে। টেসলার মতো ট্রেইলব্লেজারসহ কিছু চীনা কোম্পানি ইভি শিল্পের বিকাশে অনেকটা এগিয়েছে। সেখানে জার্মান গাড়ি নির্মাতা কোম্পানিগুলোকে সমপর্যায়ে যেতে এখনো অনেক সময় ব্যয় করতে হবে। প্রচলিত জ্বালানিচালিত ইঞ্জিন থেকে ইভিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে বহু বছর ধরে অর্জিত জার্মান ব্র্যান্ডের আস্থা জার্মানির ইভি শিল্প বিকাশে সহযোগিতা করবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির ধাক্কার প্রতিফলন উন্নত দেশগুলোতেও পরিলক্ষিত হচ্ছে। জার্মানিও তার ব্যতিক্রম নয়। দেশটির জন্য ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ভোক্তা চাহিদা কমার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিসর সংকুচিত হয়েছে। জার্মানির আইএফও ইনডেক্স সেই আশঙ্কাকেই স্পষ্ট করেছে। তা সত্ত্বেও জার্মানির ভোক্তাদের কভিড-১৯ মহামারীকালীন সঞ্চয় মূল্যস্ফীতির ধাক্কাকে কিছুটা সহনীয় করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ফিঙ্ক জানান, বর্তমান চাপের অর্থনৈতিক অবস্থা সত্ত্বেও ভোক্তা চাহিদায় গতি আসার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী। চলতি বছরে মজুরি বাড়ানোর কারণে ভোক্তা ব্যয় বেড়েছে। তবে এটি মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে দীর্ঘমেয়াদি করতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

জার্মান শ্রমবাজারও এদিকে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রথাগত পেশা থেকে ক্রমবর্ধমান পরিষেবা খাতে চাকরি ও মজুরিতে লক্ষণীয় বৃদ্ধি দেখা গেছে । শ্রম উৎপাদনশীলতা কিছুটা কমেছে, যা মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরিতে অবদান রেখেছে। শ্রমবাজারের মধ্যে নিয়ন্ত্রকদের কঠোরতা নমনীয় নিম্নমজুরি খাতের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে অটোমেশনে স্থানান্তর বা বহিরুৎপাদনে অনেকেই উৎসাহিত হচ্ছে।