আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিনের মূল্য নির্ধারণে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একক চীন। বিশ্বের শীর্ষ সয়াবিন আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীনের বাজারে আমদানি বাড়লে কিংবা কমলে আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিনের দামে উত্থান-পতন দেখা দেয়। চলতি বছর করোনা মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেলেও সয়াবিন আমদানিতে নতুন রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে চীন। দেশটির বাজারে কৃষিপণ্যটি আমদানির পরিমাণ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১০ কোটি টনের মাইলফলক ছাড়িয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত গ্রেইন ট্রেডার সিওএফসিওর (কোফকো নামে পরিচিত) পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিনের দামে বিদ্যমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। খবর রয়টার্স ও সিনহুয়া।

প্রতিষ্ঠানটির অয়েলস অ্যান্ড অয়েলসিড ট্রেডিং বিভাগের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ঝোউ জিশুয়াই বলেন, ২০২০ সালে চীনের বাজারে সয়াবিন আমদানির সম্মিলিত পরিমাণ ১০ কোটি টন ছাড়িয়ে যাবে। এর আগে আর কোনো বছর চীনে এত বেশি পরিমাণ সয়াবিন আমদানি হয়নি।

গত দুই মাসেই (অক্টোবর ও নভেম্বর) চীনা আমদানিকারকরা সব মিলিয়ে ১ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার টন সয়াবিন আমদানি করেছে বলে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস। এর মধ্যে অক্টোবরে দেশটিতে মোট ৮৬ লাখ ৯০ হাজার টন সয়াবিন আমদানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রেকর্ড ৪১ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে গত নভেম্বরে চীনের বাজারে আমদানি হয়েছে ৯৫ লাখ ৯০ হাজার টন সয়াবিন। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে চীনে কৃষিপণ্যটির আমদানি বেড়েছে ৯ লাখ টন। ২০১৯ সালের নভেম্বরে চীনে ৮২ লাখ ৮০ হাজার টন সয়াবিন আমদানি হয়েছিল। বছরের ব্যবধানে গত মাসে দেশটিতে অতিরিক্ত ১৩ লাখ ১০ হাজার টন সয়াবিন আমদানি হয়েছে।

সয়াবিনের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফরেন এগ্রিকালচারাল সার্ভিস। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা মহামারীর মধ্যে চলতি বছর চীনে সয়াবিন আমদানিতে প্রবৃদ্ধি বজায় থাকতে পারে। বছর শেষে কৃষিপণ্যটির সম্মিলিত আমদানি দাঁড়াতে পারে ৯ কোটি ৬০ লাখ টনে, যা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ১৩ শতাংশ বেশি। ২০১৯ সালে দেশটিতে আগের বছরের তুলনায় ১৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়ে ৯ কোটি ৪০ লাখ টন সয়াবিন আমদানি হয়েছিল। তবে চীনের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি ৯ কোটি ৪০ লাখ ৯৫ হাজার টন সয়াবিন আমদানি হয়েছিল।

সয়াবিনের আমদানি বাজারে চীনের অন্যতম বাণিজ্য অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। তবে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার বাণিজ্যযুদ্ধ সয়াবিনের বাজারে বড় ধাক্কা দিয়েছিল। বিরোধের জের ধরে মার্কিন সয়াবিনে বাড়তি আমদানি শুল্ক আরোপ করে বেইজিং। ফলে চীনা আমদানিকারকরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্যটির আমদানি বন্ধ করে দেন। এ পরিস্থিতি এখন অনেকটাই বদলেছে। বাণিজ্যযুদ্ধের লাগাম টানার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন আমদানি ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে চীন।

চলতি বছর আমদানি করা ১০ কোটি টনের বেশি সয়াবিনের বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনে এসেছে। স্বাভাবিকভাবে এ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিনের মূল্যবৃদ্ধিতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কৃষিপণ্যটির দাম ছয় বছরের সর্বোচ্চে উন্নীত হয়েছে। শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে (সিবিওটি) প্রতি বুশেল সয়াবিনের দাম রয়েছে ১২ ডলারের ওপরে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার কারণে বছরের মাঝামাঝি সময়ে চীনে আমদানি শ্লথ হয়ে আসায় সয়াবিনের দাম কমেছিল। তবে অক্টোবর-নভেম্বরে বাজার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। সয়াবিনের দামে বিদ্যমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা চীনের রেকর্ড আমদানি বাজার পরিস্থিতি চাঙ্গা রাখায় প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে।