ডিজিটাল প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সুফল পেতে তীব্র প্রতিযোগিতা করছে ইউরোপের দেশগুলো। এখানে গত এক দশক ধরে বাড়ছে ইউনিকর্ন কোম্পানি। এক্ষেত্রে অঞ্চলটির কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছে নর্ডিক ও বাল্টিক দেশগুলো। খবর ইউরো নিউজ।

ইউনিকর্ন হলো বেসরকারি স্টার্টআপ, যার মূল্য ১০০ কোটি ডলারের বেশি। এমন প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বেশি নজির পাওয়া যায় সিলিকন ভ্যালি নামে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার পালো অল্টো শহরে। এখানেই অ্যামাজন, মেটা কিংবা অ্যালফাবেটের মতো বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি জায়ান্টদের আবাস।

অবশ্য ইউরোপে ইউনিকর্ন কোম্পানিগুলোর অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের মতো একচেটিয়া নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও এখানে উপযুক্ত ইকো সিস্টেম গড়ে উঠেছে। আছে প্রতিভা ও বিনিয়োগ।

২০১৩ সালে ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট আইলিন লি প্রথম ‘ইউনিকর্ন’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তখন এ ধরনের কোম্পানি ছিল ৩৯, যা গত বছর পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ ছাড়িয়ে গেছে। ডাটাবেজ ব্যবস্থাপনা সংস্থা ডিলরুমের তথ্যানুসারে, ইউনিকর্নগুলোর অর্ধেকের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে; এরপর চীন ও যুক্তরাজ্যে। আর অর্ধেক মার্কিন ইউনিকর্নের আস্তানা সিলিকন ভ্যালিতে।

ইউরোপিয়ান কমিশনের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২১ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে জার্মানিতে সবচেয়ে বেশি ইউনিকর্ন ছিল, যার হিস্যা ৩০ শতাংশ। এরপর ফ্রান্স ও সুইডেনে যথাক্রমে ১৫ ও ১৪ শতাংশ।

নর্ডিকভিত্তিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম নড ভিসি অনুসারে, ইউরোপে নর্ডিক ও বাল্টিক দেশগুলো একসঙ্গে মাথাপিছু সর্বাধিক ইউনিকর্ন তৈরি করেছে। ২ কোটি ৭০ লাখ জনসংখ্যার নর্ডিক দেশগুলো ২০১৩-২৩ সালের মধ্যে ৭৩টি ইউনিকর্ন তৈরি করেছে। অর্থাৎ, ইউরোপের জনসংখ্যার মাত্র ৪ শতাংশের বিপরীতে রয়েছে মহাদেশের মোট ইউনিকর্নের ১৭ শতাংশ।

নড ভিসির ব্যবস্থাপনা অংশীদার জন এলভেসিও বলেন, ‘খুব ছোট একটি অঞ্চল থেকে অনেক অনেক শক্তিশালী কোম্পানি উঠে এসেছে। শুধু সুইডেন থেকেই আমরা ৩৯টি ইউনিকর্ন দেখেছি, ডেনমার্কে রয়েছে ১৬টি, নরওয়েতে ১১টি ও ফিনল্যান্ডে সাতটি।’

অপেক্ষাকৃত ছোট দেশ এস্তোনিয়ায় আছে ১০টি ইউনিকর্ন। প্রায় ১৩ লাখ ৫৫ হাজার জনসংখ্যার দেশটিতে রয়েছে স্কাইপ, প্লেটেক, ওয়াইজ ও বোল্টের মতো ইউনিকর্ন।

মিউজিক স্ট্রিমিং জায়ান্ট স্পটিফাইয়ের মতো সাফল্যের গল্পগুলো দেখায় যে সুইডেন ও অন্যান্য নর্ডিক দেশে রয়েছে প্রযুক্তি স্টার্টআপ বিকাশের সহায়ক পরিবেশ। এখানে রয়েছে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সহজ নাগাল, প্রযুক্তি জ্ঞান আহরণের সুবিধা, উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা। সাংস্কৃতিক দিক থেকেও সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে নর্ডিক দেশগুলো। ঝুঁকি নেয়ার মনোভাব ও ব্যর্থতার ভয় কম রয়েছে এখানকার সামাজিক কাঠামোয়।

সুইডিশ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা জন এলভেসিও মনে করেন, প্রকৃত সাফল্য দুটি মূল কারণের ওপর নির্ভর করে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশ খুব ছোট। স্থানীয় ভাষায় ব্যবসা করার সুযোগ নেই বলে আমরা কোম্পানিকে চুক্তি, সহযোগিতা ও ভাষার দিক থেকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করি। ফলে নর্ডিক দেশের যেকোনো কোম্পানি আন্তর্জাতিক স্তরে ব্যবসার জন্য প্রস্তুতি নিয়েই কাজ শুরু করে।’

উচ্চ মাত্রার ডিজিটালাইজেশনও এ অঞ্চলের সাফল্যের আরেকটি চাবিকাঠি বলে জানান তিনি।

স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখতে দেশটি ‘আই ফর এআই’-এর মতো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সুইডেন। এ উদ্যোগের আওতায় এআইয়ের শীর্ষ প্রতিভাদের প্রশিক্ষণ ও প্রকল্পের মাধ্যমে সুইডিশ এআই কমিউনিটিতে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়। দেশটিতে অভিবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা শুরু করার মতো রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম রয়েছে, এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে উচ্চশিক্ষা ও অন্যান্য সুবিধা। এ কারণে নর্ডিক অঞ্চলের উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও সাহসী মনোভাব তাদের ইউরোপের সিলিকন ভ্যালি হওয়ার পথে নিয়ে যাচ্ছে বলে মত বিশ্লেষকদের।