ওপেক প্লাস জোটে যোগ দেয়ার কারণে রাশিয়ায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও গ্যাস কনডেনসেট উত্তোলন নয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। ২০০৮ সালের পর ২০২০ সালে এসে প্রথমবারের মতো রাশিয়ার উত্তোলন কমেছে এবং ২০১১ সালের পর এবারই সর্বনিম্ন উত্তোলন দেশটির।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে ইন্টারফ্যাক্স নিউজ এজেন্সি জানায়, গত বছর প্রতিদিন ১ কোটি ২ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও গ্যাস কনডেনসেট উত্তোলন করে রাশিয়া। টনের হিসাবে ২০২০ সালে উত্তোলন কমে দাঁড়ায় ৫১ কোটি ২৬ লাখ টনে। এটা সোভিয়েত-উত্তর রাশিয়ায় সর্বনিম্ন। ২০১১ সালে দেশটির উত্তোলন ছিল ৫১ কোটি ১৪ লাখ টন।
যদিও তেল ও কনডেনসেট উত্তোলনের এ পতন আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়, এটা প্রত্যাশামাফিকই হয়েছে। বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯ মহামারী ছড়িয়ে পড়ায় গত বছরের বেশির ভাগ সময়ই জ্বালানি তেলের চাহিদা কম ছিল। এ কারণে দ্য অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ (ওপেক) ও তার জোটভুক্ত দেশগুলো গত মে মাস থেকে নজিরবিহীনভাবে জ্বালানি তেলের উত্তোলন কমিয়ে দেয়। ওপেকের কার্যত নেতা সৌদি আরবের পাশাপাশি উত্তোলন কমানোর এ দায়িত্বটা কাঁধে নেয় রাশিয়াও।
রাশিয়ার জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সিডিইউ-টেকের প্রাথমিক তথ্যমতে, গত বছর ৫১ কোটি ২৭ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও কনডেনসেট উত্তোলন করেছে রাশিয়া। এক টনে ৭ দশমিক ৩৩ ব্যারেল হিসাবে দিনপ্রতি গড়ে উত্তোলন করা হয় ১ কোটি ২ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল। টানা ১১ বছর ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধির পর এই প্রথম উত্তোলন কমল।
আগস্টে ওপেক প্লাস জোট বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ সময় রাশিয়ার জন্য উত্তোলনের কোটা বরাদ্দ ছিল প্রতিদিন ৮৯ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল, যা মে-জুলাইয়ের চেয়ে প্রতিদিন পাঁচ লাখ ব্যারেল বেশি। সিডিইউ-টেকের সরবরাহকৃত তথ্যের মধ্যে অবশ্য কনডেনসেটের কথা আলাদাভাবে বলা হয়নি, যা রাশিয়ার কোটার মধ্যেও অন্তর্ভুক্ত নয়। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) তথ্যমতে, মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ওপেক প্লাসের কমপ্লায়েন্স ৯৫ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে রাশিয়া। আইইএ মাসিক বাজার প্রতিবেদনে বলেছে, ওই সময় রাশিয়া তার কোটার চেয়ে বাড়তি ২ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন করেছে, যা প্রতিদিনের হিসাবে এক লাখ ব্যারেল।
সিডিইউ-টেকের সরবরাহকৃত তথ্যের ভিত্তিতে ব্লুমবার্গ এক প্রতিবেদনে বলেছে, ডিসেম্বরে এসে ৪ কোটি ২৪ লাখ ৬০ হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন করেছে রাশিয়া। কনডেনসেট উত্তোলন যদি আগের মাসের মতোই দিনপ্রতি ৯ লাখ ৫৬ হাজার ব্যারেল হয়, তবে রাশিয়ার প্রতিদিনের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন দাঁড়ায় ৯০ লাখ ৮৩ হাজার ব্যারেলে, যা চুক্তিতে অঙ্গীকার করা পরিমাণের চেয়ে ৯০ হাজার ব্যারেল বেশি।
২০২১ সালের জন্য কী ব্যবস্থা থাকছে
আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেল বাড়ানোর কথা থাকলেও এ চিন্তা থেকে সরে এসেছে ওপেক প্লাস জোট। নতুন নীতিতে এটি প্রতিদিন বাড়বে পাঁচ লাখ ব্যারেল।
মহামারীর মধ্যে বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদা ওঠা-নামা করতে পারে। এ কারণেই জোটভুক্ত দেশের জ্বালানিমন্ত্রীরা প্রতি মাসে আলোচনায় বসে ঠিক করবেন, চাহিদা অনুযায়ী ঠিক কী পরিমাণ অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করা যায়। আগামীকাল ওপেক প্লাস ঠিক করবে, আগামী মাসে বাজারে কতটা তেল তারা সরবরাহ করবে। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন বছরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও কনডেনসেট উত্তোলন প্রতিদিন ১ লাখ ২৫ হাজার করে বাড়াবে রাশিয়া।
ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া প্রতিদিন উত্তোলন পাঁচ লাখ ব্যারেল বাড়াতে চায় কিনা, এ নিয়ে প্রশ্নের মুখে রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আলেক্সান্ডার নোভাক গত মাসে বলছিলেন, পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক, স্থিতিশীল থাকে, আমরা উত্তোলন বাড়ানোর বিষয়টিকে সমর্থন করব। ১ জানুয়ারি থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে উত্তোলন বাড়িয়ে আমরা আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চেষ্টা করব।
ভিগোন কনসাল্টিংয়ের বিশ্লেষক দারিয়া কজলোভা বলেন, ওপেক প্লাসের পদক্ষেপের কারণে রাশিয়ার উত্তোলন প্রতিদিন গড়ে ৩০ লাখ ব্যারেল ঘাটতি রয়েছে। অনেক দেশেই টিকার প্রয়োগ (কভিড-১৯) শুরু হয়েছে, কাজেই নতুন বছরে রাশিয়ার উত্তোলন পাঁচ লাখ ব্যারেল করে বাড়বে বলে আমরা আশা করছি। আসলে বাজার পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপ। সূত্র: ব্লুমবার্গ ও রয়টার্স










