নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবির মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করে সরকার। কিন্তু রাজধানীর টিসিবির ট্রাক সেল পয়েন্টের ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উচ্চমূল্যের প্যাকেজ ছাড়া মিলছে না এসব পণ্য। ডিলারদের দাবি, টিসিবির কর্মকর্তারাও এভাবেই তাদের কাছে পণ্য বিক্রি করেন এবং প্যাকেজ আকারেই ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করতে বলেন।
রাজধানীতে টিসিবির বেশকিছু ট্রাক সেল পয়েন্ট ঘুরে প্যাকেজ পদ্ধতিতে পণ্য বিক্রির এ চিত্র দেখা গেছে। এসব এলাকার ক্রেতা-বিক্রোতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চিনি, মসুর ডাল, সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ, ছোলা ও খেজুর এ ছয় রকম পণ্য মিলে একটি প্যাকেজ করেন ডিলাররা। একেকজন ডিলার একেক রকম প্যাকেজে পণ্য বিক্রি করেন। রাজধানীতে ৬০০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ টাকার প্যাকেজ বিক্রি করতে দেখা গেছে। প্যাকেজে সয়াবিন তেল দুই কেজি, চিনি এক কেজি, খেজুর এক কেজি, মসুর ডাল এক কেজির সঙ্গে পেঁয়াজ ও ছোলা পাঁচ থেকে সাত কেজি পর্যন্ত কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে ক্রেতাদের।
ক্রেতাদের অভিযোগ, তাদের তেল, চিনি ও ডাল বেশি দরকার হয়। কিন্তু এর সঙ্গে অতিরিক্ত পেঁয়াজ ও ছোলা না নিলে চাহিদামতো পণ্য কিনতে পারেন না তারা। এদেরই একজন রাজধানীর জুরাইনের রিকশাচালক নজরুল ইসলাম। টিসিবির ট্রাক থেকে এক কেজি চিনি এবং ডাল নিতে চাইলে বিক্রেতাদের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়, ৯৮০ টাকার প্যাকেজ ছাড়া খুচরা কোনো পণ্য বিক্রয় করা হবে না। প্রায় আধা ঘণ্টার মতো অনুনয়-বিনয় করেও চাহিদামতো খুচরা পণ্য পেলেন না হতদরিদ্র এ রিকশাচালক।
একই ধরনের অভিযোগ করলেন মুরাদপুরের একজন গৃহকর্মী। তিনি এসেছেন ডাল কেনার জন্য। কিন্তু তাকেও একইভাবে প্যাকেজে পণ্য কেনার কথা বলা হয়েছে। তবে তিনি ছোলার পরিমাণ কমিয়ে ডাল বেশি কিনতে চাইলেন। পেঁয়াজের প্রয়োজন নেই বলেও জানান। এ কারণে তিনিও টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনতে পারেননি।
একই চিত্র দেখা গেল যাত্রাবাড়ীর ট্রাক সেলেও। প্যাকেজের মূল্য ৫০০ টাকার কিছু বেশি। তেল, ডাল, চিনি ও খেজুরের সঙ্গে আছে বেশি পরিমাণে পেঁয়াজ ও ছোলা। এভাবে প্যাকেজে না কিনলে খুচরা পণ্য বিক্রি করছেন না ডিলাররা। এ ট্রাকের ডিলার মরিয়ম আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, টিসিবি থেকে আমাদের যেভাবে বিক্রি করতে বলা হয়েছে আমরা সেভাবেই বিক্রি করছি। মানুষ পেঁয়াজ ও ছোলা কম নিতে চাচ্ছে। কিন্তু এখনো আমার কাছে এক টন ছোলা মজুদ রয়েছে। এ ছোলাগুলো বিক্রি না করে আমি কি লোকসান করব? আর্থিক লাভের জন্যই তো টিসিবির ডিলারশিপ নিয়েছি। এ সময় তিনি এ বিষয়ে টিসিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
নিউমার্কেট কাঁচাবাজারের পাশে টিসিবির ট্রাকের সামনে কথা হয় মর্জিনা বেগম নামের এক ক্রেতার সঙ্গে। এসেছেন ডাল আর চিনি কিনতে। তিনি বলেন, অনেক কষ্টে ২০০ টাকা সংগ্রহ করেছি। এখন প্যাকেজ না কিনলে পণ্য দেবে না বলে দিয়েছে। অনেকটা ক্ষোভের সঙ্গেই তিনি বলেন, আমরা যদি পণ্য না পাই তাহলে টিসিবির পণ্য কী বড়লোকদের জন্য?
রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা, ওয়ারি, পোস্তগোলা, শনির আখড়ায় ঘুরেও একই ধরনের চিত্র দেখে গেল। তবে ডিলারদের অভিযোগ, কখনো কখনো মানবিক বিবেচনায় প্যাকেজ ছাড়াই তেল বা চিনি বিক্রি করেন তারা। তবে ক্রেতাদের কেউ কেউ এসব পণ্য মুদি দোকানে অল্প লাভে বিক্রি করে দেন। চোখের সামনে এমন অনেক ঘটনা দেখার পর তারা ক্রেতাদের অনুরোধ পেলেও খুচরা পণ্য বিক্রি করেন না।
করোনার আগে টিসিবির ট্রাক থেকে শুধু হতদরিদ্ররাই বেশি পণ্য কিনতেন। তবে বর্তমানে এ চিত্র পাল্টেছে। অনেক মধ্যবিত্ত এমনকি উচ্চ মধ্যবিত্তদের কেউ কেউ টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনছেন। নিউমার্কেটের বাসিন্দা খায়রুল আলম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তিনি বলেন, করোনার ফলে আর্থিক দৈন্যের শিকার হয়েছি। যে কারণে টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছি। কিন্তু আমার চাহিদামতো না কিনে যদি বিক্রেতার চাহিদামতো কিনতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কী লাভ? প্যাকেজ পণ্যের যে দাম, এত দাম দিয়ে কেনার সাধ্য কারো থাকলে, সে তো সুপার শপ বা বাজার থেকেই পণ্য কিনত। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে, বিক্রেতাদের ধমক শুনে ট্রাক সেল থেকে নিত্যপণ্য কিনতে আসত না।
এদিকে প্যাকেজে বিক্রি করা পণ্যের মধ্যে পেঁয়াজের মান নিয়ে ক্রেতাদের বিস্তর অভিযোগ আছে। একই অভিযোগ করছেন ডিলারদের কেউ কেউ। তাদেরই একজন রামপুরার ডিলার হাজি এনামুল হক। তার অভিযোগ, টিসিবি তাদের পচা পেঁয়াজ ধরিয়ে দিচ্ছে। বাধ্য হয়ে সেগুলোই বিক্রি করছেন তারা। তবে অল্প পচা বা আধা পচা পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারলেও একেবারেই পচা পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারেন না।
ওয়ারির বাসিন্দা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, টিসিবি থেকে জোর করে পচা পেঁয়াজ ধরিয়ে দেয় আমাদের। খাওয়ার অযোগ্য ওই পেঁয়াজ পরবর্তী সময়ে ফেলে দেয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশিক্ষণ ও প্রচার) রজবী নাহার রজনী বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা প্রতিদিনই টিসিবির ট্রাক সেল মনিটরিং করছি। এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিযোগের সময় সবকিছু ফিটফাট দেখা যায়। অভিযানের পর কোনো ভোক্তা যদি হয়রানির শিকার হন, তবে লিখিত অভিযোগ জানালে আমরা অবশ্যই এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।
তিনি আরো বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কারণেও যদি ভোক্তারা হয়রানির শিকার হন, সে ব্যাপারেও আমরা ব্যবস্থা নেব। করোনা উপেক্ষা করে, সংসারের কাজ ফেলে, রোজা রেখে প্রতিদিন এমনকি শুক্র-শনিবারও আমরা অভিযানে নামছি। ভোক্তাদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্যই এত দৌড়ঝাঁপ করি। আমাদের অভিযানের সময় টিসিবির ট্রাক সেল মনিটরিং করার ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং কোন দিন কোন ট্রাক মনিটরিং করব তাও বলে দেয়া হয়।
এ বিষয়ে টিসিবির তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বণিক বার্তাকে বলেন, গরিব মানুষের কথা বিবেচনা করে টিসিবির ট্রাক সেলে পণ্য বিক্রি করা হয়। কোনো ধরনের প্যাকেজ বা এক পণ্যের সঙ্গে অন্য পণ্য মিশিয়ে বিক্রি করা সম্পূর্ণ অবৈধ। কোনো ডিলার যদি গ্রাহককে প্যাকেজ কিনতে বাধ্য করে কিংবা সিঙ্গেল পণ্য দিতে অস্বীকার করে এবং আমাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ সাপেক্ষে কেউ অভিযোগ করে তাহলে তার ডিলারশিপ বাতিল করা হবে। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।










