বিনিয়োগস্বল্পতা, ঊর্ধ্বমুখী দামসহ বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে এলএনজির বৈশ্বিক বাজার। এর মধ্যে ভয়াবহ সরবরাহ অনিশ্চয়তা তো রয়েছেই। অথচ প্রতিদিনই ব্যাপক হারে বাড়ছে জ্বালানিটির চাহিদা। এদিকে অনিশ্চয়তা থেকে উত্তরণের জন্য কয়েক মাস ধরে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বাড়ানো হয়েছে, যা বাজারকে আরো চাপের মুখে ফেলেছে। সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড গ্যাস কনফারেন্সে যুক্তরাজ্যভিত্তিক জ্বালানি মেজর শেল এনার্জির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টিভ হিল এসব কথা বলেছেন।

তিনি বলেন, কার্বনশূন্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, জ্বালানি সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ ও সক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। তবে পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনা গেলে বাজার ইতিবাচক দিকে মোড় নিতে পারে। সেজন্য চাই পর্যাপ্ত বিনিয়োগ।

স্টিভ বলেন, আমাদের সবসময় ভোক্তা পর্যায় থেকে শুরু করা উচিত। বাজারদরের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ ভোক্তারা যে পরিমাণ দুর্ভোগের মধ্যে পড়েন তা আমাদের বুঝতে হবে। বর্তমানে ভোক্তারা যে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন তা অনুধাবন করতে হবে।

উত্তর আমেরিকা থেকে ইউরোপের বাজারে কী পরিমাণ গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহ এবং অন্যান্য অঞ্চলে চাহিদার গতিপথ কেমন হবে, তা অনেক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর যখন ইউরোপের কথা আসছে, তখন চ্যালেঞ্জের পাল্লাটা অনেক ভারী।

স্টিভ হিল বলেন, গত বছর পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউরোপের বাজারে রাশিয়া যে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করেছে, তা যদি এলএনজিতে রূপান্তর করা হয় এবং ইউরোপে মোট সরবরাহকৃত এলএনজির সঙ্গে যোগ করা হয়, তবে এলএনজির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২০ কোটি টন। এটি বর্তমান এলএনজি ইন্ডাস্ট্রির প্রায় অর্ধেকের সমান।

এদিকে রাশিয়ান এলএনজি বর্তমানে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে বলে উল্লেখ করেন স্টিভ। এ কারণে সরবরাহ ঝুঁকি তীব্র হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে উত্তর আমেরিকা এলএনজির বড় উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য উৎস থেকে জ্বালানিটির সরবরাহ কম আসছে।

তিনি বলেন, ইউরোপের চাহিদা মেটাতে যুক্তরাষ্ট্র বেশ কয়েকটি নতুন এলএনজি সক্ষমতার উন্নয়ন করবে। এক্ষেত্রে দেশটি অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছে।

স্টিভের ভাষ্যমতে, বিশ্ববাজারে এলএনজির সংকট শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে তিন কোটি টন এলএনজির নতুন চুক্তি হয়েছে। কিন্তু শুধু দুটি ইউরোপিয়ান ক্রেতা প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে। তিন কোটি টন এলএনজির বেশির ভাগ চুক্তিই করেছে এশিয়া ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমানে আমাদের আরো ২০ কোটি টন এলএনজি প্রয়োজন। এজন্য তরলীকরণ বাড়াতে হবে।

চলতি বছর প্রকাশিত বৈশ্বিক গ্যাস রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে মহামারীর কারণে ব্যাপক তরলীকরণ প্রকল্প বিলম্বিত হয়েছে। এর মধ্যে ২০২০ সালে শুধু একটি এবং গত বছর মাত্র তিনটি প্রকল্প অনুমোদন হয়।

চলমান পরিস্থিতিতে বাজারে স্থিতি ফেরাতে পারে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি। এমনটাই মনে করছেন স্টিভ।

এশিয়া ও ইউরোপের প্রাকৃতিক গ্যাস ক্রেতারা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে স্পট মার্কেট থেকে সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার দিকে ঝুঁকছে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পদক্ষেপের ফলে এক দশক ধরে জ্বালানিটির স্পট মার্কেট বাণিজ্যে ঊর্ধ্বমুখী যে প্রবণতা ছিল, তা কমে আসতে পারে।

রাশিয়া থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ও কম মজুদ ইউরোপকে স্পট মার্কেট থেকে রেকর্ড পরিমাণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে বাধ্য করছে। এ কারণে চলতি বছরের শুরুর দিকে বিশ্ববাজারে পণ্যটির দাম সর্বকালের সর্বোচ্চে উঠে আসে। ফলে বিশ্বজুড়ে ক্রেতাদের মাঝে জ্বালানি সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা চরমে পৌঁছেছে।

কয়েক বছর ধরেই প্রাকৃতিক গ্যাস খাতে বিনিয়োগ কম। এর অর্থ হলো বাজারে নতুন সরবরাহ দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। এদিকে গত কয়েক বছরে জলবায়ু পরিবর্তন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য অনেক দেশ কয়লা থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসে স্থানান্তরিত হয়েছে। এ কারণে রাশিয়ান সরবরাহও ঝুঁকির মুখে।

ওয়ার্ল্ড গ্যাস কনফারেন্সে নরওয়েজিয়ান বহুজাতিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ইকুইনর এএসএর প্রাকৃতিক গ্যাস মার্কেটিং ও ট্রেডিং বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট পেডার জরল্যান্ড বলেন, দুই বছর আগে বিশ্ববাজারে গ্যাসের যে পরিমাণ চাহিদা ছিল, বর্তমানে তা অনেক বেশি বেড়েছে। ফলে জ্বালানি সুরক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্যে বেশির ভাগ ক্রেতাই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

তিনি আরো জানান, পাইপলাইনের মাধ্যমে ও এলএনজি আকারে গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে ইউরোপিয়ান ক্রেতারা ৫-১০ বছর মেয়াদি চুক্তিকে প্রাধান্য দিচ্ছে। অন্যদিকে এশিয়ান ক্রেতাদের কাছে ১৫-২০ বছর মেয়াদি চুক্তি বেশি আকর্ষণীয়।