পোশাক থেকে মৃৎশিল্প, হস্তশিল্প থেকে খাদ্যপণ্য—বৈশাখকে ঘিরে দেশের লাখো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার জীবন-জীবিকা আবর্তিত হয়। অথচ এ উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ এখনো প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের বাইরে। সেই শূন্যস্থান পূরণে কাজ করছে আইপিডিসি ফাইন্যান্স পিএলসি। প্রতিষ্ঠানটি শুধু ঋণ দিয়েই থেমে নেই—ক্লাস্টারভিত্তিক অর্থায়ন, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ‘জয়ী’ প্লাটফর্মের মাধ্যমে গড়ে তুলছে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির ভিত্তি। বৈশাখী অর্থনীতির সম্ভাবনা, এসএমই খাতের চ্যালেঞ্জ এবং আইপিডিসির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রিজওয়ান দাউদ সামস।

পহেলা বৈশাখকে আপনি অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কীভাবে দেখেন?

বৈশাখ আমাদের কাছে শুধু একটি সাংস্কৃতিক উৎসব নয়। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম, যা অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করে। এ সময় উৎপাদন, সরবরাহ, বিপণন ও ভোক্তা ব্যয়ের এক সমন্বিত প্রবাহ তৈরি হয়; যা গ্রামীণ ও এসএমই খাতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে পহেলা বৈশাখের প্রভাব কতটুকু?

গ্রামীণ পর্যায়ে এর প্রভাব বেশ গভীর। পোশাক, মৃৎশিল্প, বাঁশ-বেতের পণ্য, মিষ্টান্ন এবং লোকজ সামগ্রীর চাহিদা এ সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। এটি শুধু লেনদেন বাড়ায় না, বরং গ্রামীণ পরিবারের আয় বৃদ্ধি করে, এমনকি বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। অনেক নারী উদ্যোক্তা ঘরে বসেই উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত হন, যা তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়ন করে।

সেক্ষেত্রে এসএমই খাতের জন্য পহেলা বৈশাখ কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

এ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য পহেলা বৈশাখ একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক মৌসুম। নতুন ডিজাইন, ঐতিহ্যনির্ভর পণ্য এবং উৎসবকেন্দ্রিক ব্র্যান্ডিং সব মিলিয়ে বিক্রয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। অনেক উদ্যোক্তার জন্য এটি বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। আইপিডিসি এ প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে চায়। এজন্য শুধু অর্থায়ন নয়; ব্যবসা উন্নয়ন সেবা, বাজার সংযোগ ও ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও আমরা বিনিয়োগ করছি। ফলে উদ্যোক্তারা শুধু মৌসুমি নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারছেন।

পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য কী ধরনের সেবা দিচ্ছে আইপিডিসি?

পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মৌসুমি চাহিদা পূরণে আইপিডিসি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ক্লাস্টারভিত্তিক অর্থায়ন মডেল অনুসরণ করছে। এতে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় অবস্থিত একই ধরনের উৎপাদকদের সমন্বিতভাবে সহায়তা করা হয়। এর মাধ্যমে কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন দক্ষতা, সংরক্ষণ ও বিপণন সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে। কারণ উদ্যোক্তারা পণ্যের ডিজাইন উন্নয়ন, আধুনিক প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংয়ে মনোযোগ বাড়াতে পারছেন, যা স্থানীয় পণ্যকে বৃহত্তর বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছে।

আইপিডিসির ‘জয়ী’ প্লাটফর্ম কীভাবে নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা করছে?

‘জয়ী’ প্লাটফর্ম নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে আমাদের একটি মাইলফলক উদ্যোগ। এর মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তারা স্বল্প সুদে অর্থায়নের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ ও বাজার সংযোগের সুযোগ পাচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় এবারো পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে জয়ীর উদ্যোক্তাদের তৈরি পোশাক, হস্তশিল্প ও খাদ্যপণ্যকে আমরা বিশেষভাবে প্রচার করছি। তবে জয়ী শুধু একটি ফাইন্যান্সিং প্লাটফর্ম নয়—এটি এখন একটি কমিউনিটি, যেখানে উদ্যোক্তারা অভিজ্ঞতা বিনিময়, নেটওয়ার্কিং এবং সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে পারছেন।

অনানুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে আনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিকভাবে পরিচালিত হচ্ছেন, যা প্রবৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ অধিকাংশ উদ্যোক্তার কোনো ক্রেডিট হিস্ট্রি এবং ডিজিটাল লেনদেনের অভ্যাস নেই। এজন্য আমরা বিকল্প ডেটা ও সহজ কেওয়াইসি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় নিয়ে আসছি। জয়ী এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখছে, কারণ এটি নারী উদ্যোক্তাদের একটি সংগঠিত ও দৃশ্যমান নেটওয়ার্কে যুক্ত করছে।

এ বিনিয়োগের বাস্তব ফলাফল কেমন দেখছেন?

ফলাফল খুবই আশাব্যঞ্জক। বিভিন্ন বুটিকস হাউজ, হ্যান্ডলুম উদ্যোক্তা, মৃৎশিল্প উৎপাদক এবং ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি প্রস্তুতকারকরা পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে তাদের পণ্যের বিক্রি বাড়াতে পারছেন। জয়ী প্লাটফর্মের অর্থায়নে অনেক মৌসুমি ব্যবসা সারা বছরের টেকসই উদ্যোগে রূপ নিয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আয় বৃদ্ধিতে এর প্রভাব কিন্তু এখানেই স্পষ্ট।

ভবিষ্যতে এসএমই খাত নিয়ে আইপিডিসির পরিকল্পনা কী?

আইপিডিসি বিশ্বাস করে সঠিক অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে এ খাতের সম্ভাবনাকে আরো বিস্তৃত করা সম্ভব। সেজন্য ডিজিটাল লেনদেন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং বিকল্প ডেটার ব্যবহার আরো বাড়াতে চাই। লক্ষ্য একটাই—আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক, শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত অর্থনীতির পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।