নীল চাষ ঔপনিবেশিক বাংলা তথা ভারতের গর্ব ও দ্রোহের ইতিহাস। একসময় ইউরোপীয় শিল্প বিপ্লবের চালিকাশক্তি ছিল ভারতীয় নীল। তবে সময়ের সাথে সাথে আবেদন হারায় তা। প্রজন্মান্তরে নীলের সে হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসছে মাদ্রাজে। বণিক বার্তায় তিন পর্বে নীলের ঐতিহ্য, বিদ্রোহকাল ও বর্তমান অগ্রযাত্রার সলুক সন্ধান করেছেন সৈয়দ রাইয়ান আমীর

আগের পর্বে আমরা বাংলা ও মাদ্রাজের নীল শিল্পের তুলনামূলক চিত্র আলোচনা করেছি। দাম তুলনামূলক বেশি হলেও ইউরোপীয় ক্রেতাদের কাছে গুণে ও মানে অনন্য বাংলার নীলের কদর ছিল বেশি। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়াও ট্রান্সআটলান্টিক উপনিবেশ থেকেও ইউরোপে নীল যেত। তবে সেসব নীলের মান ছিল তুলনামূলক নিম্ন। তাছাড়া ভেজাল পণ্যের ভীতি ইউরোপীয় ক্রেতাদের পেয়ে বসেছিল। এ কারণে ১৬৯০-এর দশকের প্রথম দিকে মন্টসেরাটে একটি আইন পাস করা হয়। ব্রিটিশ রানীর সই করা এ আইনে ভেজাল নীল উৎপাদন ও আমদানিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিবেচনা করা হয়। আর এসব কারণে ইউরোপের বাজারে ভারতীয় তথা বাংলার নীলের চাহিদা ছিল ব্যাপক। এখানকার নীলকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল ইউরোপের ক্রমবিকাশমান বস্ত্র শিল্প। তাই ইউরোপীয়দের কাছে বাংলার নীল ছিল সোনার খনি।


তবে নীল চাষকে ঘিরে বাংলার চাষীদের অভিজ্ঞতা ছিল অম্ল-মধুর। আগেই বলা হয়েছে, নীল চাষে পানির প্রয়োজন বেশি লাগে। নীল ছাড়া অন্য ফসল আবাদ করলে বছরে একাধিকবার ফলন পাওয়া যায়। বেশি দামে রফতানি হলেও কৃষকরা দাম পেতেন কম। চাষ করতে উচ্চসুদের ঋণ নিতে হতো। তাতে বসত চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ। এসব কারণে উপনিবেশ বাংলার অনেক চাষী নীল চাষ করতে চাইতেন না। কিন্তু শাসক ইংরেজরা সোনার খনি হাতছাড়া করতে চাইবে কেন? তাই বাংলার অসহায় চাষীদের ওপর নেমে এসেছিল অত্যাচারের খড়গ। দরিদ্র চাষীদের অন্যান্য ফসলের বদলে নীল চাষে বাধ্য করা হতো। ওই সময় চাষীদের কাছে নীলকুঠি ছিল চরম আতঙ্কের একটি নাম। এসব ইংরেজ কুঠিতে ‘অবাধ্য’ চাষীদের ধরে এনে বন্দি করে রাখা হতো। অত্যাচার করা হতো।

এসব অন্যায়-অত্যাচারের ফলাফল হিসেবে বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে তুমুল কৃষক আন্দোলন, ইতিহাসে যা নীল বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ইতিহাসবিদদের মতে, এ আন্দোলনের জের ধরে একসময় বাংলা থেকে হারিয়ে যায় নীলের সোনালি অতীত।


নদিয়ার কৃষ্ণনগরের চাষীদের হাত ধরে বাংলায় নীল বিদ্রোহের সূচনা, ১৮৫৯ সালে। অল্প সময়ের মধ্যে তা বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, পাবনা, খুলনা, ফরিদপুরে ছড়িয়ে পড়ে। কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ আগে থেকেই ছিল। বিদ্রোহের ডামাডোল তাতে ঘি ঢালে। একের পর এক নীলের গুদামে আগুন দেয় বিক্ষোভকারীরা। অত্যাচারী জমিদাররা নীল বিদ্রোহে অন্যতম টার্গেটে পরিণত হন। স্বাভাবিকভাবে জীবন ও গদি বাঁচাতে ইংরেজ শাসকদের দ্বারস্থ হন তারা। ইংরেজরাও সোনার খনি হাতছাড়া করতে নারাজ ছিল। ফলে ইংরেজ ও জমিদারদের মিলিত দমন-পীড়নের শিকার হন বিক্ষোভকারী চাষীরা। তত্পর হয়ে ওঠে নীলকুঠিগুলো। বেড়ে যায় অত্যাচারের মাত্রা। একে একে কৃষক নেতাদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। এ আন্দোলনের জের ধরেই ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ সরকার ‘ইন্ডিগো কমিশন’ গঠন করতে বাধ্য হয়। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, মানুষের রক্তের দাগ না রেখে নীলের একটি কণাও ইংল্যান্ডে পৌঁছেনি। দুই বছর পর প্রণীত হয় ইন্ডিগো অ্যাক্ট।

এসব নিয়ে বাংলায় বিস্তর ইতিহাস রচিত হয়েছে। দীনবন্ধু মিত্রর রচনা ঐতিহাসিক নাটক নীল দর্পণে তখনকার চিত্র সুন্দরভাবে উঠে এসেছে। সেসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ নেই। একই সঙ্গে বিদ্রোহ সফল নাকি ব্যর্থ, তা নিয়েও অনেক আলোচনা হয়েছে। তবে মোটা দাগে বলা যায়, নীল বিদ্রোহ বাংলায় ইংরেজ নিপীড়নের স্বরূপ উন্মোচন করেছিল। ফলে এক পর্যায়ে গিয়ে বাংলা থেকে নীল চাষের প্রচলন হারিয়ে যায়। যদিও অনেকেই বলেন, এর পেছনে কৃষক বিদ্রোহ যতটা ভূমিকা রেখেছে, ততটাই ভূমিকা ছিল ইউরোপের বস্ত্র শিল্পে সস্তা কৃত্রিম নীলের ব্যবহার শুরু হওয়ার। তার পরও বাংলার ঔপনিবেশিক ইতিহাস লিখতে গেলে নীল বিদ্রোহ আলাদা জায়গা দখল করে থাকবে।

বাংলার ধারাবাহিকতায় একসময় মাদ্রাজ থেকেও নীল চাষের প্রচলন উঠে যায়। অত্যাচার-নিপীড়ন-প্রতিবাদের মুখে উপমহাদেশের অন্যতম শীর্ষ রফতানি পণ্যটি এক পর্যায়ে পুরোপুরি ব্রাত্য হয়ে পড়ে। উপনিবেশ শক্তির হাত ধরে শুরু হয়ে তাদের হাত দিয়েই নীল চাষ হারিয়ে ফেলে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আবেদন। জায়গা করে নেয় ইতিহাসের পাতায়। একুশ শতকে হারিয়ে যাওয়া নীলের ঐতিহ্য নতুন করে ফিরে আসছে। তবে সেটা বাংলায় নয়, মাদ্রাজের বুকে। এ নিয়ে পরবর্তী পর্বে থাকছে বিশদ আলোচনা।

 

ছবি: অ্যালামি স্টক ফটো ও অ্যাসপিরান্ট ফোরাম