কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট স্থলবন্দরটি পূর্ণাঙ্গ রূপে চালু করতে এপারে স্থলবন্দরের অবকাঠামোসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারি নানা পদক্ষেপ নেয়া হলেও ওপারের নানা কার্যক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, সম্প্রতি ভারতীয় ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট ১০ চাকার ট্রাক ব্যবহারে বাধা দেয়ায় মাসের বেশির ভাগ সময় বন্ধ থাকছে কয়লা ও পাথর আমদানি। এতে বাণিজ্য কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে বন্দর।

সর্বশেষ ভারতের গোলকগঞ্জ থানার লক্ষ্মীবাড়ী এলাকার ব্যবসায়ীরা ১০ চাকার ট্রাক চলাচলে বাধা দেয়ায় প্রায় তিন মাস ধরে বন্ধ রয়েছে আমদানি কার্যক্রম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভুটানসহ ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে কয়লা ও পাথর আমদানি বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক। কিন্তু সোনাহাট স্থলবন্দরসংলগ্ন এলাকার ভারতীয় ব্যবসায়ীরা চান বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা তাদের কাছ থেকে কয়লা ও পাথর আমদানি করুক। আর স্বার্থের এ দ্বন্দ্বের কারণেই মূলত আমদানি বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থলবন্দর চালুর পর ভারত থেকে শুধু কয়লা ও পাথর আমদানি হলেও বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে রফতানি হচ্ছে আরএফএলের প্লাস্টিক পণ্য ও রিফাইন পাম অয়েল।  এরই মধ্যে এ বন্দর দিয়ে প্লাস্টিক পণ্যের পাশাপাশি পাম অয়েলের কয়েকটি চালান ভারতে পাঠানো হয়েছে।

শুরুর দিকে আগ্রহী না হলেও বর্তমানে সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে

পণ্য রফতানি করতে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ বাড়ছে। বন্দরটিতে ইমিগ্রেশন চালু হলে ভারত থেকে কমলা, আপেলসহ বিভিন্ন ফলমূল, মসলা ও বাংলাদেশ থেকে সব ধরনের পণ্য আমদানি-রফতানি শুরু হবে বলে জানান বন্দরসংশ্লিষ্টরা।

এ বন্দর দিয়ে পাথর, কয়লা, তাজা ফল, ভুট্টা, গম, চাল, ডাল, রসুন, আদা ও পেঁয়াজসহ ১০টি পণ্য আমদানি এবং বিধি অনুযায়ী সব ধরনের বৈধ পণ্য রফতানি করার কথা থাকলেও ভারত থেকে শুধু কয়লা ও পাথর আমদানিতে সীমাবদ্ধ আছে।

সোনাহাট স্থলবন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী মো. শাহিন জানান, প্রায় দুই বছর ধরে সোনাহাট স্থলবন্দরের ব্যবসায়ীরা ঠিকমতো ব্যবসা করতে পারছেন না। বড়জোর এক সপ্তাহ কয়লা, পাথর আসার পর আবার তা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর ১৫ দিন থেকে তিন মাস পর্যন্ত আমদানি বন্ধ থাকে। এতে করে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা।

সোনাহাট স্থলবন্দর আমদানি-রফতানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক জানান, ওভারলোডিংয়ের অজুহাতে অনেক সময় দীর্ঘদিন ভারতের সড়কে ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকার ফলেও আমরা মোটা অংকের আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছি। বর্তমানে এ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টন পাথর ও কয়লা ভারত থেকে আমদানি হয়। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আহরণ হয়। বিদ্যমান সমস্যার দ্রুত সমাধান হলে রাজস্ব আহরণ আরো বাড়বে বলে মনে করেন এ ব্যবসায়ী।

সোনাহাট স্থলবন্দর হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. হামিদুল ইসলাম জানান, এ অঞ্চলের প্রায় দুই হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে বন্দরে। ভারতীয় নানা সমস্যায় বিভিন্ন সময় পণ্য আমদানি বন্ধ থাকলে বিপাকে পড়ে যান এসব শ্রমিক।

সোনাহাট স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের ওয়্যারহাউজ ইনচার্জ মাহফুজুল হক ভুইয়া জানান, এ বন্দরে ওয়্যারহাউজ, পার্কিং ডক ইয়ার্ডসহ অবকাঠামো সবই তৈরি আছে। পণ্য আমদানি-রফতানি বাড়লে সরকারের রাজস্বের পাশাপাশি সব ক্ষেত্রেই লাভবান হবেন বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।

সোনাহাট স্থলবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ সভাপতি রাকিব আহমেদ জুয়েল জানান, ১০ চাকার ট্রাক চলাচলে বাধা দেয়ায় সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি আপাতত বন্ধ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলছে।

১৯৯৫ সালে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ সোনাহাট স্থল শুল্কস্টেশন স্থাপনের প্রজ্ঞাপন জারি করে। ১৯৯৬ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বঙ্গসোনাহাট স্থলবন্দরকে ল্যান্ড পোর্ট হিসেবে ঘোষণা দেয়। এরপর ২০১৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় সোনাহাট স্থলবন্দর চালু করা হয়।

ব্যবসায়ীরা জানান, ভারতের সাতটি অঙ্গরাজ্যের বাংলাদেশের সঙ্গে সড়কপথে পণ্য পরিবহনের সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে এ সোনাহাট স্থলবন্দরটি। সোনাহাট স্থলবন্দর ব্যবহার করে ভারতের সেভেন সিস্টারখ্যাত আসাম, মেঘালয়, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা ও অরুণাচল রাজ্যের সঙ্গে সড়কপথে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। ভারত থেকে পণ্য আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে সড়কপথে পরিবহনে ৪০০ কিলোমিটার পথ সাশ্রয় হওয়ায় লাভবান হবেন দু-দেশের ব্যবসায়ীরা। ইমিগ্রেশন চালু হলে পর্যটন ও পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখবে এ বন্দর।