চীনে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। গতকাল প্রকাশিত এক সরকারি প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, গুপ্তচরবৃত্তি ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে চীন ছেড়ে যাচ্ছে বিদেশী করপোরেশনগুলো। খবর নিক্কেই এশিয়া।
চীনের স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব ফরেন এক্সচেঞ্জের প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছর দেশটিতে নিট এফডিআই ছিল ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। গত বছরের এ পরিসংখ্যান ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ কম। যদিও ২০২২ সালে নতুন বিনিয়োগ ছিল ইতিবাচক। কিন্তু গত বছর এফডিআই টানা দ্বিতীয় বছরে কমেছে, যা উদ্বেগের। ২০২১ সালে এফডিআই ছিল সর্বকালের সর্বোচ্চ, ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলার।
গত বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ইনফ্লো (অর্থ প্রবেশ) ১ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এটি পূর্ববর্তী প্রান্তিকের রেকর্ড করা নিট আউটফ্লোর (অর্থ বের হয়ে যাওয়া) কাছাকাছি।
সত্তরের দশকের শেষ দিকে দেং জিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে সংস্কার ও মুক্ত বাণিজ্যনীতি গ্রহণ করে চীনা। এর অধীনে বিদেশ থেকে বিনিয়োগ, কর্মী ও প্রযুক্তি আকর্ষণ করার জন্য কাজ করছে দেশটি। ১৯৯২ সালে দক্ষিণ চীন সফরের সময় দেং জিয়াওপিং এ নীতিকে ত্বরান্বিত করার জন্য চাপ দেন। ওই সময়ের পর থেকে এফডিআই বর্তমানে নিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
চীন সরকার গুপ্তচরবৃত্তির বিরুদ্ধে সাড়াশি অভিযানসহ জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় আরো বেশি মনোযোগ দিয়েছে। বাজার বিশ্লেষণ ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনাকারী গবেষণা সংস্থাগুলোর ওপর কর্তৃপক্ষ কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এছাড়া বিদেশী কোম্পানির শ্রমিকদের আটক করার খবর পাওয়া গেছে। এর পর থেকে বিদেশী কোম্পানিগুলো চীনে তাদের কার্যক্রম কমিয়ে দিয়েছে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা গ্যালাপ গত বছর চীন থেকে তাদের কার্যক্রম প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো প্রায়ই বিনিয়োগের আগে ব্যবসায়িক অবস্থার ওপর ব্যাপক গবেষণা চালায়। কিন্তু গত বছরের জুলাইয়ে কার্যকর হওয়া গুপ্তচরবৃত্তি বিরোধী আইন সংশোধনের কারণে অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম স্বাধীনভাবে চালাতে পারছে না।
একটি মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একজন এক্সিকিউটিভ জানিয়েছেন, নতুন বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা তারা পরিচালনা করতে পারেননি।
জাপানি ব্যবসায়ীরাও একই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গত বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে চীনে পরিচালিত জাপানি কোম্পানিগুলোর একটি জরিপে কয়েকজন উত্তরদাতা জানিয়েছেন, গুপ্তচরবৃত্তি বিরোধী আইনের অনিশ্চয়তার কারণে তাদের দৈনন্দিন জীবন উৎকণ্ঠার মধ্যে দিয়ে কাটছে। এছাড়া তাদের কোম্পানিগুলোর সদর দপ্তর নতুন বিনিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করছে না।
চীনা উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসায় কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। চীনা চিপ থেকেও স্পষ্টত দূরে থাকছে দেশটি। তথ্য পরিষেবা প্রতিষ্ঠান রোডিয়াম গ্রুপের মতে, ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাপী চিপ-সম্পর্কিত এফডিআই-এর ৪৮ শতাংশ পেয়েছিল চীন। কিন্তু এই সংখ্যা ২০২২ সালে ১ শতাংশে নেমে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে চিপ-সম্পর্কিত এফডিআই একই সময়ের মধ্যে শূন্য শতাংশ থেকে ৩৭ শতাংশে বেড়েছে। যেখানে ভারত, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার সম্মিলিত বিনিয়োগ ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৮ শতাংশ হয়েছে।
চীনা গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, চিপ তৈরির সরঞ্জাম প্রস্তুত করে মার্কিন কোম্পানি টেরাডিন।
সম্প্রতি চীনের জিয়াংসু প্রদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কারখানা স্থানান্তর করেছে কোম্পানিটি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অ্যাপ্লিকেশনের জন্য চিপ তৈরি করে ব্রিটেনের গ্রাফকো। কোম্পানিটি চীনে এরই মধ্যে বেশির ভাগ কর্মচারীকে ছাঁটাই করেছে বলে জানা গেছে। গাড়ি নির্মাতা মিতসুবিশি মোটরস গত অক্টোবরে জানিয়েছে, চীনে ব্যক্তিগত গাড়ি উৎপাদন বন্ধ করবে। টয়োটা মোটর ও হোন্ডা মোটর তাদের চীনা যৌথ উদ্যোগে কর্মী কমিয়ে আনছে।
বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে দীর্ঘস্থায়ী মন্থরতার কারণেও বিদেশী কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। রিয়েল এস্টেট খাতে মন্দার কারণে অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল হয়েছে। এছাড়া মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে বলে সতর্কতা সংকেত রয়েছে। চীন নতুন করে এফডিআই আকর্ষণের জন্য এখন কী কৌশল অবলম্বন করে, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।










