নভেল করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারী পুরো বিশ্বকে টালমাটাল পরিস্থিতিতে ফেলেছে। দেশে দেশে টানা লকডাউন চলমান থাকায় তৈরি হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি। তবে এমন সংকটময় পরিস্থিতিতেও পরিবেশবাদীরা পেয়েছেন সুসংবাদ। করোনা মহামারী ও লকডাউনে চলতি বছর কয়লার বৈশ্বিক ব্যবহার আগের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কমে এসেছে। তবে জ্বালানি পণ্যটির বৈশ্বিক ব্যবহারে এমন মন্দা ভাব সাময়িক। আগামী বছর কয়লার বৈশ্বিক ব্যবহার চলতি বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়তে পারে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। খবর বিজনেস লাইন ও রয়টার্স।

প্যারিসভিত্তিক আইইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের পর থেকে চাহিদা বিবেচনায় ভালো সময় কাটায়নি বৈশ্বিক কয়লা খাত। গত দুই বছরে জ্বালানি পণ্যটির বৈশ্বিক ব্যবহার প্রায় ৭ শতাংশ কমে এসেছে। পরিমাণের হিসাবে তা ৫০ কোটি টন। এর পেছনে মূলত দুটো কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারে অনেক দেশ আগের তুলনায় সচেতন হয়ে উঠেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের লাগাম টানার দাবির মুখে কমে এসেছে কয়লার ব্যবহার। দ্বিতীয়ত, করোনা মহামারী ও লকডাউনে অর্থনৈতির গতি শ্লথ হয়ে আসায় অন্যান্য শিল্পের মতো কয়লা খাতও উত্তোলন, ব্যবহার ও রফতানিতে সংকটে পড়েছে।

‘কোল ২০২০’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আইইএ বলছে, চলতি বছর কয়লার বৈশ্বিক ব্যবহারের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৭২৪ কোটি ৩০ লাখ টনে। করোনা মহামারীর জের ধরে এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি পণ্যটির বৈশ্বিক ব্যবহার কমতে পারে ৫ শতাংশ। তবে আগামী বছর বিশ্বজুড়ে কয়লা ব্যবহারে প্রবৃদ্ধি ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখছে আইইএ। প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বজুড়ে কয়লার সম্মিলিত ব্যবহার ৭৪৩ কোটি ২০ লাখ টনে দাঁড়াতে পারে। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি পণ্যটির বৈশ্বিক ব্যবহার বাড়তে পারে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। পরিমাণের হিসাবে তা প্রায় ২০ কোটি টন বেশি।

এক বিবৃতিতে আইইএর এনার্জি মার্কেটস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ বিভাগের পরিচালক কেইসুকি সাদামোরি বলেন, মহামারী শুরুর আগেও আমরা ভেবেছিলাম চলতি বছর বিশ্বজুড়ে কয়লার ব্যবহার বাড়তির দিকে থাকবে। তবে করোনা সংক্রমণ সব চিত্র ওলটপালট করে দিয়েছে। করোনাকালে কয়লার বৈশ্বিক ব্যবহার বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এবারই জ্বালানি পণ্যটির বৈশ্বিক ব্যবহারে সর্বোচ্চ পতন দেখা যেতে পারে। যদিও এ ধাক্কা খুবই অল্প সময়ের জন্য। আগামী বছর নাগাদ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে আসতে পারে কয়লার বৈশ্বিক ব্যবহার।

কয়লার বৈশ্বিক বাজার আগে পশ্চিমের উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোকে ঘিরে পরিচালিত হতো। এখন সময় বদলেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কয়লা বেচাকেনা এখন মূলত এশিয়া মহাদেশে স্থানান্তরিত হয়েছে। জ্বালানি পণ্যটির বৈশ্বিক বাণিজ্যের কেন্দ্রে এখন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো। আইইএর হিসাবে বিশ্বজুড়ে উত্তোলন হওয়া ৭৫ শতাংশ কয়লার ক্রেতা এশিয়া দেশগুলো, যা এ অঞ্চলের দেশগুলোয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার হয়।

ভারত, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনামসহ এশিয়ার উন্নয়নকামী ও দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির দেশগুলো জ্বালানি পণ্যটির ব্যবহার উত্তরোত্তর বাড়িয়ে চলেছে। এ ধারাবাহিকতায় ২০৩০ সাল নাগাদ এশিয়ার বাজারে কয়লার (থার্মাল কোল) সম্মিলিত চাহিদা ১১০ কোটি টনে পৌঁছে যেতে পারে। সম্প্রতি প্রকাশিত মিনারেলস কাউন্সিল অব অস্ট্রেলিয়ার (এমসিএ) এক গবেষণায় এ সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।

এদিকে আইইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী দিনগুলোয় কয়লার বৈশ্বিক ব্যবহারে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি অর্জনের পেছনে মূল ভূমিকা রাখবে এশিয়ার দেশগুলো। তবে ২০২৫ সাল নাগাদ বৈশ্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার হিস্যা ছাড়িয়ে যেতে পারে সৌর, পানি, বায়ুর মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি। এ সময় বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারে জ্বালানি তেল ব্যবহার করে। তালিকায় এর পরই থাকবে প্রাকৃতিক গ্যাসের নাম। অর্থাৎ বৈশ্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে কয়লার ব্যবহার ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। এ ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সাল নাগাদ কয়লার তুলনায় জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।