গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে চীন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার শক্ত পদক্ষেপ নেয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল দেশটি। এ লক্ষ্যে কয়লার ব্যবহার এবং উত্তোলন কমানোর পদক্ষেপও নিয়েছিল বেইজিং। কিন্তু চলতি বছর নতুন করে দেশটিতে আরো কয়লা খনি নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। আসন্ন বছরগুলোয় দেশটিতে কয়লার চাহিদা আরো বাড়তে পারে এমন ভাবনায় নতুন করে এসব কয়লা খনির অনুমোদন দিয়েছে বেইজিং। দেশটির ন্যাশনাল এনার্জি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনইএ) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। খবর রয়টার্স।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনার অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়েছে চীন। দীর্ঘমেয়াদি এসব পদক্ষেপের মধ্যে দেশটির অভ্যন্তরীণ কয়লার চাহিদাও কমিয়ে আনার কথা জানিয়েছিল বেইজিং। কিন্তু এনইএ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধে দেশটিতে নতুন কয়লা খনির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে অধিক কয়লা উত্তোলনের লক্ষ্য হিসেবে এ অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এনইএ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির এনার্জি রেগুলেটর কর্তৃপক্ষ চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত নতুন করে ১৪ কোটি ১০ লাখ টন কয়লা উত্তোলনের সক্ষমতা তৈরির অনুমোদন দিয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যার পরিমাণ ২ কোটি ৫০ লাখ টন বেশি।
দেশটির ইনার মঙ্গোলিয়া, জিনজিয়াং, সানজি ও সানসি প্রদেশে নতুন এসব কয়লা খনির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিকল্পনার অংশ এবং বিদ্যমান কয়লা খনির সম্প্রসারণ কার্যক্রম হিসেবে এসব প্রদেশে নতুন কয়লা খনির অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে এনইএ। যদিও সংস্থাটি এসব বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি।
বর্তমানে দেশটিতে জীবাশ্মবিহীন জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু বেইজিং আগামী বছরের শেষ সময়ের মধ্যে এর পরিমাণ বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ আর ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গত বছর দেশটি তাদের কয়লার ব্যবহার কমিয়ে ৫৯ শতাংশে নিয়ে এসেছিল।
আগামী বছর জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক সম্মেলনে কার্বন নির্গমন ইস্যুতে সর্বোচ্চ প্রতিশ্রুতি দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে চীন। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন ইসু্যুতে দেয়া প্রতিশ্রুতিও নতুন করে বিবেচনা করা হতে পারে এ সম্মেলনে। একজন সরকারি বিশেষজ্ঞ কয়লা ব্যবহারের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন।
তার মতে, ২০২১-২৫ সালের মধ্যে দেশটি সর্বোচ্চ কী পরিমাণ কয়লা ব্যবহার করবে, সেটির একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। এসব লক্ষ্য পূরণে দেশটি হেবি ও বেইজিংয়ের মতো ধোঁয়া অধ্যুষিত এলাকায় এরই মধ্যে কয়লার ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে। পাশাপাশি এসব এলাকায় কয়েকশ ছোট কয়লা খনি এবং কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে।
কিন্তু এসব পরিকল্পনা ও কর্মকাণ্ডের মধ্যে চীন নতুন করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কয়লা উত্তোলন এবং কয়লাচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুমোদন দিল।
পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিসের জ্বালানিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক লওরি মালিভার্টা বলেন, নতুন করে এসব কয়লা খনির অনুমোদন ছোট ছোট খনি এবং পুরনো খনিগুলোর পরিবর্তে ব্যবহার হতে পারে।
তবে তিনি মনে করেন, চীনের জ্বালানি পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী এক বা দুই দশক বর্তমান কয়লা উত্তোলন অব্যাহত রাখতে হবে। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্যারিস চুক্তির সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হবে। কারণ চলতি বছর দেশটির কয়লা উত্তোলন ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। বছরের প্রথমার্ধে দেশটির কয়লা উত্তোলনের পরিমাণ ছিল ১৭৬ কোটি টন।
দেশটিতে পুনর্ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি ও পরমাণু খাতে বিনিয়োগ এখন অপর্যাপ্ত। কিন্তু অব্যাহতভাবে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। ফলে আগামী আরো কয়েক বছর কয়লাচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে চীনের।
চীনের রাষ্ট্রীয় গ্রিড করপোরেশনের গবেষণা ইউনিটের দেয়া প্রাক্কলন অনুযায়ী, দেশটিতে কয়লাচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনে সর্বোচ্চে পৌঁছবে। এর পরিমাণ দাঁড়াবে ১ হাজার ২৩০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ গিগাওয়াট। ফলে দেশটিতে কয়লাচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির পরিমাণ হবে ২০০-৩০০ গিগাওয়াটের মতো।
এসব প্রাক্কলনের আগে চলতি বছরের শুরুতে নতুন করে দেশটিতে ২৯০ গিগাওয়াট উৎপাদন সক্ষম, কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কথা জানানো হয়। আর এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্যই নতুন করে দেশটিতে কয়লা খনি নির্মাণের এ অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।










