দুবাই, হংকং, সিঙ্গাপুর ও লন্ডনসহ বৃহৎ আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন স্থানে ভিড় করছেন বিশ্বের ধনী ও অতিধনীরা। তাদের হাত ধরে এসব জায়গায় পুঁজির স্থানান্তর ঘটছে বিপুল পরিমাণে। তবে গোপন ও প্রকাশ্য সম্পদের সুরক্ষার কেন্দ্র হিসেবে এখনো এশিয়ার ধনীদের কাছে সবচেয়ে ভরসার জায়গা সুইজারল্যান্ড। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অন্যান্য আর্থিক কেন্দ্রের তুলনায় ইউরোপের দেশটিকে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বুকিং সেন্টার বা সম্পদ ও বিনিয়োগের আইনি নথিভুক্তির নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করছেন তারা। দেশটির ব্যাংক ও আর্থিক খাতের কঠোর গোপনীয়তার নীতির সুবিধা নিয়ে স্বর্ণসহ বিপুল পরিমাণ আর্থিক সম্পদ জমা করছেন সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকগুলোয়। খবর এফটি।

বৈশ্বিক ব্যাংক ও আর্থিক খাতের পর্যবেক্ষকদের ভাষ্যমতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন এবং ব্যাংকিং নিরাপত্তার নিশ্চয়তার কারণে এশিয়ার অতিধনীরা এখন সুইস বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলছেন। এসব ব্যাংকের ভল্টে সম্পদ জমা করছেন তারা।

বর্ধিত এ চাহিদা বিবেচনায় রেখে সুইজারল্যান্ডে ব্যক্তি খাতের স্থানীয় ব্যাংকগুলো এশিয়ার ধনীদের জন্য বিশেষায়িত কর্মীর সংখ্যা বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে গত দুই বছরে এশিয়া থেকে রেফারেল ও অনুসন্ধান ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নজরে এসেছে তাদের। এরই সুবিধা নিতে এশীয় অতিধনীদের ব্যাংকিং সুবিধা দেয়ার বিষয়ে আলাদা করে মনোযোগ দিচ্ছেন তারা।

হংকং, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ের মতো আর্থিক কেন্দ্রগুলোয় সাম্প্রতিক বছরে অফশোর সম্পদ পরিচালনা দ্রুত হারে বাড়ছে। গত বছর হংকং ও সিঙ্গাপুর থেকে পরিচালিত হয়েছে যথাক্রমে ২ লাখ ৬৫ হাজার ও ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি ডলারের সম্পদ। তবে এশিয়ার অঞ্চল দুটি সুইস প্রাইভেট ব্যাংকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নতুন গ্রাহক উৎসে পরিণত হয়েছে। কারণ এখানে আসা সম্পদের বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডে প্রবাহিত হচ্ছে।

বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ (বিসিজি) অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত অফশোর সম্পদের সম্মিলিত আকার ছিল ২ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন বা ২ লাখ ৭৪ হাজার কোটি ডলার। এর মাধ্যমে অফশোর সম্পদের শীর্ষ কেন্দ্র হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে দেশটি।

কয়েক দশক ধরে অবস্থানের নৈকট্য ও বিভিন্ন সুবিধার কারণে এশিয়ার ধনীদের কাছে সম্পদ স্থানান্তরের গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হতো হংকং ও সিঙ্গাপুর। তবে গত দুই-তিন দশকে সুইস ব্যাংকগুলো এশিয়ায় কার্যক্রম বাড়িয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের লক্ষ্য হলো এ অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান ধনীদের সামনে সুইস ব্যাংক থেকে সেবাগ্রহণের সুবিধাকে তুলে ধরা এবং প্রাইভেট ব্যাংকিং মডেলের সম্প্রসারণ।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ব্যাংকাররা বলছেন, এশিয়ার অতিধনী ব্যক্তিরা এবং ফ্যামিলি অফিসগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে তাদের অর্থ দেশটিতে স্থানান্তর করছে। তারা সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করতে চাচ্ছে এবং এমন একটি নিরাপদ স্থান খুঁজছে, যেখানে স্বর্ণসহ অন্যান্য স্থানান্তরযোগ্য মূল্যবান সম্পদ ভল্টে নিরাপদ ও গোপনীয়তার সঙ্গে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে।

তাদের ভাষ্যমতে, এশিয়ার গ্রাহকদের কাছে তারা চাইছেন, অন্য কোথাও বসবাস বা কাজ করলেও তাদের বিনিয়োগ আইনিভাবে সুইজারল্যান্ড থেকে পরিচালিত হোক। ব্যাংকারদের মতে, এ প্রত্যাশার কারণ হলো বিশ্বব্যাপী প্রিমিয়ার হ্যাভেন হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে সুইজারল্যান্ড। যদিও ব্যাংক খাতে গোপনীয়তা কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক চাপের কারণে সুইজারল্যান্ডের পুরনো অবস্থানে ভাটা পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

লোমবার্ড ওডিয়ের এশিয়া প্রাইভেট ক্লায়েন্টস বিভাগের প্রধান নির্বাহী ওমর শাকুর বলেন, ‘ক্রমবর্ধমানসংখ্যক গ্রাহক এখন জানতে চাচ্ছে, তারা সুইজারল্যান্ডে ব্যাংকিং সুবিধা বুক করতে পারে কিনা। এটি সম্পদ স্থানান্তরে নতুন গতিপ্রকৃতি নির্দেশ করছে।’

তবে অন্যান্য প্রভাবকও কাজ করছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে হংকংয়ে নতুন কঠোর জাতীয় নিরাপত্তা আইনের প্রচলন এবং এরপর ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের মতো রাজনৈতিক ধাক্কা এশিয়ার ধনীদের মধ্যে সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

জুরিখে জুলিয়াস বায়ারের এশিয়া ডেস্কের প্রধান ক্রিশ্চিয়ান ক্যাপেলি বলেন, ‘২০১০ সালে এশিয়ার গ্রাহকদের সুইজারল্যান্ডে বুকিংয়ের চাহিদা খুব কম ছিল। কোনো বিশেষ সুবিধা ছিল না। সিঙ্গাপুরের মতো জায়গায় বুকিং দিয়েও ঠিক একই রকম সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যেত।’

২০১৯ সালের পর এ পরিস্থিতি বদলে গেছে। তিনি বলেন, ‘গ্রাহকরা ক্রমবর্ধমানভাবে অনুভব করছেন, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির আভাস পাওয়া এখন আরো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বিভিন্ন দেশ ও নিয়মের অধীনে সম্পদ রাখা গুরুত্বপূর্ণ।’

সুইজারল্যান্ডে এলজিটি প্রাইভেট ব্যাংকিংয়ের এশিয়া-প্যাসিফিক বিজনেস বিভাগের প্রধান ক্রিশ্চিয়ান ফ্রাই বলেন, ‘সুইজারল্যান্ড এশিয়ার বাইরে থাকা গ্রাহকদের জন্য বুকিং সেন্টার অব চয়েস হয়ে উঠেছে। আমরা দেখছি, বেশির ভাগ এশীয় গ্রাহক সম্পদের প্রায় ১০-১৫ শতাংশ নিজ অঞ্চলের বাইরে রাখেন। কখনো কখনো আরো বেশি। যখন তারা এশিয়ার বাইরে কোনো জায়গা বেছে নেন, সাধারণত সে জায়গা হয় সুইজারল্যান্ড।’

সুইস আরেকটি বেসরকারি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, নন-ডম ট্যাক্সের নিয়ম এশিয়ার গ্রাহকদের কাছে লন্ডনের আকর্ষণ কমিয়েছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সেখানকার প্রপার্টি খাত তাদের জন্য বেশ লোভনীয় ছিল। এখন সে সুবিধা নিচ্ছে সুইজারল্যান্ড।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ব্যাংকগুলো এখন তাদের এশিয়া ডেস্কের আয়তন ও কর্মপরিধি সম্প্রসারণ করছে। নব্বইয়ের দশক থেকে সুইজারল্যান্ডে এশিয়া ডেস্ক পরিচালনা করছে জুলিয়াস বায়ার। প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সাল থেকে নিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ইউবিএসের এশিয়া ডেস্ক এখন শতাধিক কর্মী নিয়ে গঠিত। এলজিটির এশিয়া ডেস্কে কর্মীর সংখ্যা ২০২৩ সালেও ছিল ১০-এর কম। বর্তমানে জুরিখ ও জেনেভায় এ ডেস্কের কর্মী সংখ্যা ৩০-এর কাছাকাছি।