জার্মানির ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঘিরে ক্রমশ বাড়ছে গ্রাহক ও সঞ্চয়কারীদের অভিযোগ। আগের সময়ের তুলনায় গত বছর প্রায় ৫ শতাংশ বেশি অভিযোগ জমা পড়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপরীতে। দেশটির সরকারি তথ্য বলছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল ও নমনীয় ভূমিকাই এক্ষেত্রে দায়ী। খবর রয়টার্স।
ওয়্যারকার্ড কেলেঙ্কারির পর ভোক্তা সুরক্ষায় জোর দিচ্ছে জার্মানির আর্থিক নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ ফেডারেল ফাইন্যান্সিয়াল সুপারভাইজরি অথরিটি (বাফিন)। তিন বছর আগে অতিরিক্ত ঋণের বোঝার কারণে দেউলিয়া হয়ে যায় ওয়্যারকার্ড। কেলেঙ্কারি বিষয়টি যখন জনসমক্ষে আসে, তখন জানা যায় ব্যালান্সশিটে ১৯০ কোটি ইউরো (২০০ কোটি ডলারের বেশি) মিথ্যা হিসাব দেখিয়ে নিজেদের প্রোফাইল ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বড় করে দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ঘটনাটি প্রথম ধরা পড়ে আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের নিরীক্ষায়। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ওয়্যারকার্ডের ব্যালান্সশিটে দেখানো ১৯০ কোটি ইউরোর কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু বিষয়টি সরকারি ওয়াচডগ বাফিনের নজর এড়িয়ে যাওয়ায় চারদিকে সমালোচনার ঝড় ওঠে এবং গ্রাহকের আস্থায়ও চিড় ধরে।
গত বছর ইউরোপের গ্রাহকদের কাছ থেকে ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারীদের সম্পর্কে ১৫ হাজার অভিযোগ পেয়েছে বাফিন। যা ২০২১ সালে প্রাপ্ত সাড়ে ১২ হাজার অভিযোগের তুলনায় বেশি। তাছাড়া টানা চার বছর ধরেই দেশটির আর্থিক খাত ঘিরে গ্রাহকের অভিযোগের সংখ্যা বেড়ে চলেছে।
ব্যাংকার ও ভোক্তা সুরক্ষা নিয়ে কাজ করেন এমন আইনজীবীদের মতে, অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার জন্য দীর্ঘ প্রক্রিয়াকরণ সময়, শর্তাবলির পরিবর্তন ও শাখা নেটওয়ার্কের সংকোচন। প্রথমবারের মতো রয়টার্স এ বিষয়ে একটি পরিসংখ্যান তৈরি করেছে, যা আগামী মে মাসে বার্ষিক প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ হবে।
তবে পক্ষ সমর্থন করে এক সাক্ষাৎকারে বাফিনের কর্মকর্তা চ্যান-জাই ইউ বলেন, ‘গ্রাহকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ সত্ত্বেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো করছে—এমনটা হতে পারে না।’ এদিকে জার্মান ব্যাংকিং শিল্প কমিটি ডয়েচে ক্রেডিটউইর্টশ্যাফ্ট বলছে যে জার্মানির ব্যাংকগুলো ভীষণ টেকসই, শক্তিশালী ও উচ্চমাত্রায় আত্মবিশ্বাসী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা সুইজারল্যান্ডের আর্থিক খাতের অস্থিরতা দ্বারা এগুলো কোনোভাবেই প্রভাবিত নয়।
কিন্তু গত বছর আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউগভের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, জার্মানির আর্থিক খাতকে ঘিরে আস্থার মাত্রা কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও এশীয় প্রধান অর্থনীতির তুলনায় কম ও বিশ্বব্যাপী গড়ের নিচে ছিল।
তাছাড়া দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যাডেন-উয়ের্টেমবার্গ রাজ্যের আইনজীবী নিলস নৌহাউসার ভোক্তা অধিকারের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন দুই দশক ধরে। তিনি বলেন, ‘এটি সত্য যে ভোক্তারা ক্রমবর্ধমানভাবে আমাদের কাছে প্রশ্ন করছেন ও পরামর্শের জন্য আসছেন। যা দ্বারা প্রমাণিত হয়, ভোক্তারা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করেন না।’
চলতি বছরে আইনি প্রতিষ্ঠান আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের এক জরিপে দেখা যায়, ২৫ শতাংশ জার্মান নাগরিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থাশীল, ৩১ শতাংশ আস্থাশীল নয় ও ৪৪ শতাংশ উত্তর দেয়া থেকে বিরত রয়েছে।
নিজস্ব পরিসংখ্যানে ডয়েচে ক্রেডিটউইর্টশ্যাফ্ট উল্লেখ করে, যেকোনো শিল্প যা বড় পরিসরে গ্রাহককে পরিষেবা প্রদান করে, সেখানে কিছু ক্ষেত্রে গ্রাহক ও ব্যাংকের মধ্যে মতের পার্থক্য থাকে।
তবে গত বছর বাফিনের তুলনায় ভোক্তাদের অভিযোগের পরিমাণ কম দেখিয়েছে এটি।
জার্মান আদালত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো অবশ্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিতের বিষয়গুলোয় পর্যবেক্ষণ বাড়িয়েছে। তবে ওয়্যারকার্ড জালিয়াতি কাণ্ডের পর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাফিনকে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। পরিস্থিতি সামলাতে প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের পরিবর্তন আনে সংস্থাটি।
আগে জার্মানির ব্যাংকগুলো চাইলে গ্রাহকের সম্মতি ছাড়াই পরিষেবা সংক্রান্ত খরচ বাড়াতে পারত। এ নিয়ম চলে আসছিল কয়েক দশক ধরে। কিন্তু ২০২১ সালে জার্মানির উচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে এক রায়ের মাধ্যমে এ নিয়ম বদলে দেয়া হয়। রায়টি ব্যাংকগুলোকে এর শর্তাবলি পরিবর্তনকে কঠিন করে দিয়েছে। এ রায়ের বিপরীতে ব্যাংকাররা মন্তব্য করেছিলেন, ফলে আমলাতন্ত্রের পাশাপাশি বাড়তি খরচ যোগ হয়েছে।










