কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ইউরোজোনের অর্থনীতি। চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে সংকুচিত হয়েছে ব্লকটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম। ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে নাকাল অঞ্চলটির অর্থনৈতিক ক্ষত আরো গভীর হতে পারে। পড়তে পারে মন্দার কবলে। এমন পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের মাসিক প্রতিবেদনে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থান সংকট মন্থরতার পেছনে ভূমিকা রাখছে। প্রাথমিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, ইউরোজোনের পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) ৪৬ দশমিক ৫ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা ৩৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। চূড়ান্ত প্রাক্কলনে এর খুব একটা পরিবর্তন হবে না বলে মনে করছে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল।
পিএমআই ৫০ পয়েন্টের ওপরে থাকলে কারখানার কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও নিচে থাকলে সংকোচন বোঝায়। নতুন কার্যাদেশ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, সরবরাহের সময় ও স্টক লেনদেন পর্যালোচনার মাধ্যমে জরিপটি পরিচালনা করা হয়। বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে ক্রয়াদেশ এবং শিল্প উৎপাদন কার্যক্রম। প্যান্থিয়ন ম্যাক্রোইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ ক্লজ ভিস্টেসেন বলেন, ‘এটা দুঃখজনক। পিএমআই দেখে মনে হচ্ছে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে অর্থনীতিতে সংকোচন দেখা দেবে।’
এসঅ্যান্ডপি জানিয়েছে, ২০২০ সালের নভেম্বরের পর ইউরোজোনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম এখন সবচেয়ে কম। সে সময় অর্থনীতি মহামারীর অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পতন ঘটেছিল সে সময়টায়। অন্যান্য খাতের চাহিদাও ছিল নিম্নমুখী। আর চাহিদা কমে যাওয়ায় কমে গেছে শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রবণতা, যার প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থান তৈরির হারে। পাশাপাশি রয়েছে শ্রমবাজারে ছাঁটাইয়ের প্রবণতা।
ব্লকের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে রফতানি কমে যাওয়া এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোয় ব্যয় বেড়ে গেছে। হামবুর্গ কমার্শিয়াল ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ সাইরাস দ্য লা রুবিয়া বলেন, ‘ইউরোজোনের পরিস্থিতি খারাপ থেকে খারাপের দিকে যাচ্ছে। পরপর দুই প্রান্তিকে সংকোচনের মধ্য দিয়ে মন্দায় পড়তে পারে ব্লকের অর্থনীতি।’
৩১ অক্টোবর প্রকাশিত হবে জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধির তথ্য। পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে, দ্বিতীয় প্রান্তিকের তুলনায় তৃতীয় প্রান্তিকে সংকোচন ঘটবে অর্থনীতিতে। পিএমআই জরিপে কোম্পানি কার্যক্রম সম্পর্কে পূর্বাভাসে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। পরিষেবা খাতে তুলনামূলকভাবে গতি থাকলেও সার্বিকভাবে বছরজুড়েই খারাপ ছিল পরিস্থিতি।
জার্মানিতে বাণিজ্যিক কার্যক্রম সংকুচিত হয়েছে তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে। পরিষেবা ও শিল্পোৎপাদন খাতে ধীরগতি অব্যাহত। কোম্পানিগুলোয় এখনো সুদহার বাড়ানো, ভোক্তা চাহিদা হ্রাস ও মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা রয়েছে। পরিষেবা খাতে ফ্রান্সের অবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো। তার পরও খাতটিতে চাহিদা ও নতুন ক্রয়াদেশ কমে গেছে। ইউরোজোনের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দেশটিতে চলতি প্রান্তিকে অর্থনীতি সংকোচনের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে যুক্তরাজ্যে বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে মন্দার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পিএমআই সূচকে কারখানা কার্যক্রমের মন্থরতা উঠে আসছে। সুদহার বৃদ্ধির জেরে দেখা দিয়েছে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। ঋণব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তারা সতর্ক হয়ে উঠছেন। তারা খরচ কমাচ্ছেন। আর ভোক্তাদের প্রতিক্রিয়া প্রভাবিত করেছে পরিষেবা খাতের পিএমআইকে। ইউরোপীয় অঞ্চলের নেতিবাচক প্রবণতা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ঊর্ধ্বমুখী গতি দেখা যাচ্ছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিয়েছেন, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগেভাগেই সুদহার আর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেবে না। আর সেটা হলে ১৫ মাস ধরে চলমান সুদহারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ছেদ ঘটবে। অর্থনীতিবিদ ক্রিস্টফ ওয়েইল বলেন, ‘ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরেক দফা সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে।’










