নবায়নযোগ্য জ্বালানির চাহিদা বাড়লেও লোকসানে পড়েছে বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো। বাজার বিশ্লেষকরা জানান, উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প ও উচ্চ সুদের কারণে এমনটা হয়েছে। খবর ইয়াহু ফাইন্যান্স।
ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির তথ্যানুসারে, চলতি বছর প্রায় ৫০০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন প্যানেলের চাহিদা রয়েছে। সৌরবিদ্যুতের জন্য একদিনে ১০০ কোটি ডলার পর্যন্ত লেনদেন হতে পারে। এর পরও এ খাত দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প ও উচ্চ সুদ সৌর বিদ্যুতের চাহিদা মন্থর করেছে।
বায়ুবিদ্যুৎ সরঞ্জাম তৈরির শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান জিনজিয়াং গোল্ডউইন্ড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি কোম্পানির প্রতিবেদন অনুসারে, তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ৯৮ শতাংশ কম হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম তৈরির শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান লোঙ্গি গ্রিন এনার্জি টেকনোলজি কোম্পানির প্রধান জানান, সৌর প্যানেলের মূল্য অবিশ্বাস্যভাবে কমছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সানপাওয়ার করপোরেশন চাহিদা কমে যাওয়ায় পুরো বছরের পূর্বাভাস দ্রুত কাটছাঁট করেছে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির চাহিদার পতন ঘটেছে, যা সবচেয়ে খারাপ সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
হংকংভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান রোবেকোর পোর্টফোলিও ম্যানেজার ভিকি চি বলেন, ‘বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম তৈরি করা কোম্পানিগুলোর অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। জুনে কোম্পানিগুলো বিশ্বব্যাপী ১৯ হাজার ৭০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বায়ু ও সৌর বিদ্যুতের খাত দুটি পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী। এর তুলনায় অনবায়নযোগ্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও সফটওয়ারের অধিক চাহিদা রয়েছে। যেখানে চাহিদা অনেক সময় প্রত্যাশা ছাড়িয়ে যায়।’
নবায়নযোগ্য জ্বালানি শিল্পের সমস্যা হচ্ছে, কোম্পানির শেয়ারের দ্রুত দরপতন। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল ক্লিন এনার্জির সূচক ৩০ শতাংশ পতন হয়েছে। যেখানে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এনার্জির সূচক ঊর্ধ্বমুখী।
চার বছরের মধ্যে ২০২২ সালে পতনের পর সৌরবিদ্যুতের চেয়ে বায়ুবিদ্যুৎ খাত আরো খারাপ সময় পার করছে। তবে এ বছর শেষে বায়ুবিদ্যুতের বাজার গতি পেতে পারে। ২০২১ সালে এ ব্যবসা চীনের বাইরে ভালো অবস্থানে ছিল। যুক্তরাষ্ট্র থেকে যুক্তরাজ্য পর্যন্ত জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কর হ্রাস করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে লাভজনক করার কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা।
ইউরোপীয় বায়ুবিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোয় তিন লাখ লোক চাকরি করে। এত লোকের চাপ কোম্পানিগুলো সামলাতে পারছে না। সবচেয়ে বড় বায়ুবিদ্যুৎ কোম্পানি অরস্টেড এ/এস নিশ্চিত করেছে, তৃতীয় প্রান্তিকে লোকসানে পড়ায় প্রতিষ্ঠানটি কিছু প্রকল্প আটকে দিয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ টারবাইনে সমস্যা বাড়ায় সিমেন্স এনার্জি এজি কোম্পানি সম্ভাব্য লোকসান এড়াতে সরকারি নিশ্চয়তা চেয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিএনইএফ জানায়, ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা বেড়েছে। চীনাদের লক্ষ্য উপসাগরীয় দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা। এজন্য তারা ২০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেয়।
সৌরবিদ্যুতে মূল সমস্যা অতিমাত্রার সক্ষমতা। ২০২৩ সালে সৌর প্যানেলের বৈশ্বিক চাহিদা ৫৫ শতাংশ বেড়েছে। ৪০০ গিগাওয়াট সক্ষমতার প্লান্ট স্থাপন করাই যায়। কিন্তু এক হাজার গিগাওয়াট সক্ষমতার প্লান্টের কারখানা চালানো অথবা নির্মাণের পরিকল্পনা পুরো প্রক্রিয়া ব্যাহত করছে।
লোঙ্গি গ্রিন এনার্জি টেকনোলজির মুখপাত্র জানান, চীনের সাতটি প্রধান কোম্পানি তৃতীয় প্রান্তিকে মুনাফা যুক্ত করতে পেরেছে। এটা ২০২১ সালের পর সবচেয়ে কম। এ কোম্পানিগুলো বৈশ্বিক চাহিদার ৮০ শতাংশ পূরণ করে। দুই-তিন বছরের মধ্যে অর্ধেক কোম্পানি ব্যবসা ছাড়তে বাধ্য হবে।
বিএনইএফের বিশ্লেষক ইয়োরু তান বলেন, ‘২০২৩ সালের শেষ পর্যন্ত সৌর প্যানেলের দরপতন অব্যাহত থাকবে। সবচেয়ে ভালো কোম্পানিটির পক্ষেও প্রবৃদ্ধি করা খুব কঠিন। অপেক্ষাকৃত ছোট ও কম পুঁজির কারখানাকে টিকে থাকতে রীতিমতো লড়াই করতে হবে।’
চীনের জিংকো সোলার কোম্পানির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা গেনের মিয়াও বলেন, ‘আগামী বছরে পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ার আশা করছি। অধিকাংশ চীনা প্রকল্পে সৌরবিদ্যুতের চাহিদা অব্যাহত থাকবে। ইউরোপে কমলেও যুক্তরাষ্ট্রে চাহিদা বাড়বে।’
যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট সোলার ইনকরপোরেশন তুলনামূলক স্থিতিশীল। পরিবেশবান্ধব গৃহসামগ্রী তৈরিতে কোম্পানিটি শতকোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। চলতি বছর কোম্পানিটি তৃতীয় প্রান্তিকে প্রায় ৩০০ শতাংশ আয় বাড়িয়েছে। যদিও ছাদে ব্যবহৃত সৌরপ্যানেল প্রস্তুতকারী ইনফেজ এনার্জি ইনকরপোরেশন এবং সোলারএজ টেকনোলজি ইনকরপোরেশন তৃতীয় প্রান্তিকে লোকসান করেছে।
লোঙ্গি গ্রিন এনার্জি টেকনোলোজির প্রেসিডেন্ট লি ঝেংগুও বলেন, ‘বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে কারো পক্ষে লাভজনক অবস্থানে থাকা কঠিন। কিছু কোম্পানি নতুন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা হয়তো বাদ দেবে।’










