বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান রয়েছে মূল্যস্ফীতি। দেশে দেশে রেকর্ড উচ্চতায় বিভিন্ন পণ্যের দাম। মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় সুদের হার বাড়াচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। ঋণের উচ্চ ব্যয় পুঁজিবাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে ঘনীভূত হচ্ছে মন্দার আশঙ্কা। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্যোগ এড়িয়ে চলছে। ফলে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) নিম্নমুখী হয়েছে একত্রীকরণ ও অধিগ্রহণ (এমঅ্যান্ডএ) কার্যক্রম।

রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর একত্রীকরণ ও অধিগ্রহণ চুক্তি শুষ্ক মৌসুমে প্রবেশ করেছে। কারণ ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও পুঁজিবাজারে বিপর্যয় অনেক করপোরেট বোর্ডের ব্যবসা সম্প্রসারণ পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে প্ররোচিত করেছে। পাশাপাশি ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন এবং অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রমকে ধাক্কা দিয়েছে।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডিয়েলজিকের তথ্য অনুসারে, এপ্রিল-জুনে ঘোষিত চুক্তির মূল্য গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ১ লাখ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক সিটিগ্রুপের ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের এমঅ্যান্ডএ বিভাগের প্রধান অ্যালিসন হার্ডিং-জোনস বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো সাময়িকভাবে এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়িক মন্দার প্রভাবের দিকে বেশি মনোযোগী। কারণ আগামীতে চুক্তি করার অনেক সময় পাওয়া যাবে।

ডিয়েলজিকের তথ্য অনুসারে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রম ৪০ শতাংশ কমে ৪৫ হাজার ৬০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। যদিও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এ কমার হার ১০ শতাংশ। তবে ইউরোপই একমাত্র অঞ্চল, যেখানে এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রম সংকুচিত হয়নি। বরং এ সময়েও অঞ্চলটিতে একত্রীকরণ ও অধিগ্রহণ ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।

এদিকে ব্যবসা সম্প্রসারণ শ্লথ হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে আয়ও কমে গিয়েছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে এ আয় ৮৪ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ে ৮৫২টির তুলনায় গত তিন মাসে মাত্র ২৭৪টি প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে নগদ অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করেছে।

সিটিগ্রুপের এমঅ্যান্ডএ বিভাগের বৈশ্বিক সহপ্রধান মার্ক শাফির বলেন, বর্তমানে একত্রীকরণ ও অধিগ্রহণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধ নিয়ে আমরা শঙ্কিত।

গত তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় চুক্তি ছিল চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ব্রডকম ইনকরপোরেটেডের ভিএমওয়্যার অধিগ্রহণ। ৬ হাজার ১০০ কোটি ডলারে ক্লাউড কম্পিউটিং কোম্পানিকে কিনে নেয় ব্রডকম। এছাড়া বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলোন মাস্কের ৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে প্রস্তাবিত টুইটার অধিগ্রহণ।

কয়েক মাস ধরে পুঁজিবাজারে অস্থিরতার কারণে প্রতিষ্ঠানের বোর্ডগুলো ব্যয়বহুল খরচ করা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। মার্কিন পরামর্শক সংস্থা সলোমন পার্টনারসের প্রধান নির্বাহী মার্ক কুপার বলেন, আগামী কয়েক প্রান্তিকে আমরা বড় অংকের একত্রীকরণ বা অধিগ্রহণ চুক্তি দেখতে পাচ্ছি না। প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ৫২ সপ্তাহের নিম্ন পর্যায়ে লেনদেন করছে, তখন এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রম পরিচালনা করা খুব কঠিন।

চলতি বছরের প্রথমার্ধে আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের পরিমাণ ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমে গিয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্বের পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপে মার্কিন বিনিয়োগের শক্তিশালী ধারা অব্যাহত থাকেনি। গোল্ডম্যান স্যাকস গ্রুপের ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের এমঅ্যান্ডএ বিভাগের প্রধান আন্দ্রে কেলেনার্স বলেন, আপনি যখন নির্বাহীদের মনোবিজ্ঞান ও সীমান্ত অতিক্রম করার জন্য তাদের আত্মবিশ্বাসের স্তর সম্পর্কে চিন্তা করবেন, তখন আপনাকে বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা এবং এটি কীভাবে সময়কে প্রভাবিত করছে তা বিবেচনা করতে হবে।