রাশিয়ার ইউক্রেন হামলা বিশ্বজুড়ে কৃষিপণ্য উৎপাদক ও ব্যবহারকারীদের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এমন এক সংকটাপন্ন সময়ে সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে, যখন কয়েক মাস ধরেই জ্বালানি ও উৎপাদন উপকরণের দাম আকাশচুম্বী। এতে মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট হচ্ছে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলো। রফতানি বন্ধ করে দেয়াসহ নানা পলিসি গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে শীর্ষ কৃষিপণ্য উৎপাদক দেশগুলোর সরকার।

এদিকে যুদ্ধের আগে থেকেই লম্বা সময় ধরে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে শীর্ষ খাদ্যশস্য ও তেলবীজ উৎপাদক দেশগুলো বিপাকে। খরা পরিস্থিতির কারণে উৎপাদন দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে, যা সরবরাহ খাতকে আরো চাপের মুখে ফেলছে। এছাড়া জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধি ও বিশ্বের প্রধান বন্দরগুলোয় কার্গোজটের কারণে পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এসব বিষয় গম, চাল, ভুট্টাসহ বিশ্বের প্রধান খাদ্যশস্যগুলোর বাজারদরে ঊর্ধ্বমুখিতা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে নিত্যদিনের খাবারের দাম মেটাতে হিমশিম খেতে হবে ভোক্তাদের।

বর্তমানে উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোই খাদ্যপণ্য মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মধ্যে। বেশির ভাগ দেশই কৃষিপণ্য আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভারত, মিসর ও আফ্রিকার দেশগুলো।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এরই মধ্যে সতর্ক বার্তা দিয়েছে। চলতি বছরের মার্চে সংস্থাটির বাজার আদর্শ খাদ্যপণ্যের মূল্য নির্দেশক অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ফলে আগামী দিনের জন্য বিশ্লেষকরা খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক বাজার সম্পর্কে নিরাশার বাণীই দিচ্ছেন। এপ্রিলে খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক কিছুটা কমেছিল। কিন্তু তা এখনো গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি।

এফএওর অর্থনীতিবিদ মনিকা তোথোভা সম্প্রতি এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল কমোডিটি ইনসাইটকে জানান, কয়েক মৌসুমজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ক্রেতাদের খাদ্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধের প্রস্ততি নিয়ে রাখা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংসের তথ্যানুযায়ী, গমের সবচেয়ে বড় আমদানিকারকরা এরই মধ্যে ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিশ্চিতে হিমশিম খাচ্ছেন। তারা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির দিকে ঝুঁকছেন। এ সুযোগে বিক্রেতারা দাম আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক কৃষিপণ্যের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে রাশিয়া ও ইউক্রেন। বৈশ্বিক গম রফতানির ২৫ শতাংশই আসে দেশ দুটি থেকে। পাশাপাশি সূর্যমুখী তেল, ভুট্টা, সার, যব ও শরঘামের অন্যতম প্রধান উৎসও এ দুই দেশ।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এসব পণ্যে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্যের বাজার অব্যাহত চাপের মুখে পড়ছে। যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের বন্দরগুলো বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। তবে দেশটির রফতানিকারকরা রেলপথে বাণিজ্য অব্যাহত রাখার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। যদিও জাহাজের সক্ষমতার মতো রেলপথে বড় পরিসরে পণ্য পরিবহন সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া সব গন্তব্যে রেলপথে পণ্য পাঠানোও অসম্ভব।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস জানায়, ইউক্রেনের মতো বড় পরিসরে ব্যাহত হয়নি রাশিয়ার গম রফতানি। চীনসহ প্রধান প্রধান বাণিজ্য অংশীদার দেশ রাশিয়া থেকে আমদানি অব্যাহত রেখেছে। তবে দেশটি ইউরোপে বাজার হারাচ্ছে।

মিসর বিশ্বের শীর্ষ গম আমদানিকারক। দেশটি গমের সরবরাহ নিশ্চিতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কারণ একদিকে গমের দাম চড়া, অন্যদিকে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল থেকে গম রফতানি বন্ধ।

তথ্য বলছে, রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রাশিয়ান বাজার আদর্শ গমের দাম প্রায় ৪৬ শতাংশ বেড়ে যায়। মার্চে পণ্যটির দাম টনপ্রতি রেকর্ড ৪৫৫ ডলারে উন্নীত হয়। ২০২২-২৩ মৌসুমে গমের বৈশ্বিক মজুদ প্রায় এক কোটি টন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছে মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ)।

এদিকে যুদ্ধসহ অন্যান্য সংকটের পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়ার পাম অয়েল রফতানি বন্ধের ঘোষণা পরিস্থিতি আরো জটিল করে তোলে। ফলে সব ধরনের ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যায়।

বিকল্প হিসেবে ব্যবসায়ীরা সয়াবিন ও সূর্যমুখী তেল কেনার কথা ভাবলেও তা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ সয়াবিনের প্রধান উৎস লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় খরার কারণে উৎপাদন তলানিতে। অন্যদিকে যুদ্ধের কারণে শীর্ষ সূর্যমুখী তেল রফতানিকারক দেশ ইউক্রেন থেকে সরবরাহ বন্ধ। ফলে সহসাই দাম কমার সম্ভাবনা দেখছেন না বিশ্লেষকরা। ভোজ্যতেলের দাম বাড়ায় বেশি বিপাকে শীর্ষ আমদানিকারক দেশ ভারত। এমনকি সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশ হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্সের মতো দেশের জন্যেও মূল্যস্ফীতি সামাল দেয়া চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।