কয়েক মাস ধরেই বিশ্বজুড়ে কমছে খাদ্যপণ্যের গড় দাম। তবে বিশ্ববাজারে কমলেও এশিয়ায় বাজারদর ঊর্ধ্বমুখী থাকার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। এদিকে দাম কমলেও তা ঐতিহাসিক সর্বোচ্চের কাছাকাছিই অবস্থান করছে। খবর সিএনবিসি

জাপানের আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান নোমুরার এক অর্থনীতিবিদ জানান, খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধিতে ছেদ পড়লেও এশিয়ার বাজারে দাম বাড়ার আশঙ্কা এখনো কাটেনি। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অঞ্চলটিতে বাজারদরে ফের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

নোমুরা হোল্ডিংসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান অর্থনীতিবিদ সোনাল বার্মা সিএনবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেন, খাদ্যপণ্যের দামে উত্থান-পতনের দিক থেকে বৈশ্বিক গতিশীলতার কাছে পিছিয়ে পড়বে এশিয়া। এ অঞ্চলের দেশগুলোর সরকার খাদ্যপণ্যে ভর্তুকি ও দাম কমাতে নানা উদ্যোগ নিলেও তা খুব কম সময়ের জন্য সফলতার মুখ দেখবে।

নোমুরার দেয়া তথ্যানুযায়ী, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন ও ভারতের মতো দেশগুলো চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে খাদ্যপণ্যের সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধির মুখোমুখি হবে। ভারত গম ও চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও বর্তমানে তীব্র দাবদাহের কারণে দেশটির উৎপাদন বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গম রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে ভারত। ফলে দেশটির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো শস্যটির সরবরাহ নিশ্চিতে হিমশিম খাচ্ছে। আর বাকি দেশগুলো খাদ্যপণ্য আমদানিনির্ভর হওয়ায় এসব দেশে দাম বাড়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

এফএওর খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মাসে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক দাম আগের মাসের তুলনায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখেছে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল, দানাদার খাদ্যশস্য ও চিনির ব্যাপক দরপতন। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় খাদ্যপণ্যের দাম এখনো ২৩ দশমিক ১ শতাংশ বেশি, যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছে।

তথ্য বলছে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালালে অস্থির হয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক পণ্যবাজার। খাদ্যশস্য, ধাতব পণ্য কিংবা জ্বালানি তেল—সব ধরনের পণ্যের দামই তখন আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। মার্চে এফএওর খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক রেকর্ড সর্বোচ্চে আরোহণ করে। ওই সময় মূল্যসূচক দাঁড়িয়েছিল ১৫৯ দশমিক ৭ পয়েন্টে। তবে গত মাসে সূচক কমে ১৫৪ দশমিক ২ পয়েন্টে স্থির হয়েছে।

এফএও খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক অনুযায়ী, গত মাসে দানাদার খাদ্যশস্যের দাম আগের মাসের তুলনায় ৪ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় শস্যটির দাম এখনো ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে জুনে গমের দাম ৫ দশমিক ৭ শতাংশ কমলেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। এর পেছনে দায়ী করা হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে। কারণ ২০২০ সালেও বৈশ্বিক গম রফতানিতে দেশ দুটির হিস্যা ছিল ২৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

এফএও বলছে, গত মাসে রাশিয়া গম রফতানি বাড়িয়েছে। তার ওপর উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোয় নতুন গম সংগ্রহ বেড়েছে। এছাড়া আবাদ পরিস্থিতিও বেশ ভালো ছিল। এসব কারণেই জুনে দাম কমেছে।

এদিকে গত মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম সবচেয়ে বেশি কমেছে। আগের মাসের তুলনায় মূল্যসূচক ৭ দশমিক ৬ শতাংশ নিচে নেমেছে। বৈশ্বিক সরবরাহ বাড়ায় পাম অয়েলের দাম কমেছে। এছাড়া দুর্বল চাহিদার প্রভাবে কমেছে সূর্যমুখী ও সয়াবিন তেলের দাম। এক মাসের ব্যবধানে চিনির দাম ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখেছে ঊর্ধ্বমুখী সরবরাহ ও নিম্নমুখী চাহিদা।

এদিকে সব খাদ্যপণ্যের গড় দাম কমলেও এক মাসের ব্যবধানে ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে দুগ্ধপণ্যের দাম। এছাড়া গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ। এর মধ্যে পনিরের দাম সর্বাধিক বেড়েছে। এক্ষেত্রে ইউরোপে দাবদাহ এবং কৃত্রিম মজুদকে দায়ী করা হচ্ছে।