নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং এর জের ধরে চলা লকডাউন ও শ্রমিক সংকটে গভীর সংকটে পড়েছে ভারতের চা শিল্প। করোনার কারণে চলতি বছর দেশটিতে পানীয় পণ্যটির উৎপাদনে রীতিমতো ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উৎপাদন হ্রাসের জের ধরে কমে আসতে পারে ভারত থেকে পানীয় পণ্যটির রফতানিও। খবর বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও কৃষি জাগরণ।

টি বোর্ড অব ইন্ডিয়ার তথ্যের বরাত দিয়ে গ্লোবাল টি ডাইজেস্টের সংকলনকারী রাজেশ গুপ্তা জানান, ২০২০ সালের শুরু থেকে গত অক্টোবর পর্যন্ত ভারতের বাগানগুলোয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় চা উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমেছে। উৎপাদন হ্রাসের পরিমাণ ১৫ কোটি ১৬ লাখ কেজি। এর পেছনে অন্যতম কারণ লকডাউন চলার সময় উৎপাদন সীমিত হয়ে আসা, শ্রমিক সংকট ও প্রতিকূল আবহাওয়া।


এ তিন কারণে চলতি বছরের জানুয়ারি-অক্টোবর সময়ে আসাম, পশ্চিবঙ্গসহ ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোয় চা উৎপাদন ১৫ কোটি ২২ লাখ কেজি বা ১৫ দশমিক ১৫ শতাংশ কম হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এসব রাজ্যে সব মিলিয়ে ১০০ কোটি ৫১ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে পানীয় পণ্যটির সম্মিলিত উৎপাদন ৮৫ কোটি ২৯ লাখ কেজিতে নেমে এসেছে।

সামগ্রিকভাবে দেশটিতে চা উৎপাদন কমে গেলেও তামিলনাড়ু, কেরালা, কর্ণাটকসহ দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্যগুলোয় ২০১৯ সালের জানুয়ারি-অক্টোবর সময়ের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে বাড়তি কিছু চা উৎপাদন হয়েছে। যদিও এর পরিমাণ খুব একটা বেশি নয়।


২০১৮ সালে ভারতীয় চা শিল্প সর্বকালের সর্বোচ্চ উৎপাদন ও রফতানির রেকর্ড গড়েছে। এ সময় পানীয় পণ্যটির সম্মিলিত উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১৩২ কোটি ৫০ লাখ কেজি। এ পরিমাণ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭ কোটি ৪৫ লাখ কেজির তুলনায় অনেক বেশি। শতাংশের দিক দিয়ে এ বৃদ্ধি প্রায় ৬ শতাংশ। পরের বছরও এ বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত ছিল। ২০১৯ সালে ভারতের বাগানগুলোয় সব মিলিয়ে ১৩৮ কোটি ৯৭ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়েছে।

তবে চলতি বছরের পরিস্থিতি ভিন্ন। ২০২০ সালের শুরুর দিক থেকে করোনা মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে ভারত। টানা লকডাউন চলার সময় দেশটির চা বাগানগুলো নজিরবিহীন শ্রমিক সংকটে ভুগেছে। ব্যাহত হয়েছে চা উৎপাদন ও পরিশোধন কার্যক্রম। কার্যত স্থবির ছিল পানীয় পণ্যটির রফতানিও। সংকট এতটাই গভীর হয় যে কলকাতার নিলামে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দার্জিলিং চায়ের সরবরাহ শূন্যে নেমে আসে।

পরবর্তী সময়ে প্রতিকূল আবহাওয়া (ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডব) আসাম, পশ্চিমবঙ্গের চা বাগানগুলোর সংকট আরো বাড়িয়ে দেয়। মূলত এসব কারণে চলতি বছর বড় ধরনের উৎপাদন ঘাটতির দিকে এগিয়ে চলেছে ভারতের চা শিল্প। কয়েক বছর ধরে টানা রেকর্ড উৎপাদনের পর ২০২০ সাল শেষে প্রথমবারের মতো পানীয় পণ্যটির উৎপাদনে ধস নেমে আসছে।

চা প্রায় প্রতিটি ভারতীয় পরিবারে পরম আকাঙ্ক্ষিত পানীয়। কারো পছন্দ গরম ধোঁয়া ওঠা চা। কেউবা পছন্দ করেন কোল্ড চা। আবার অনেকে আশ্চর্যজনক স্বাস্থ্য উপকারিতা থাকা গ্রিন টি ও ব্ল্যাক টি পছন্দ করেন। ভারতীয় চায়ের ব্র্যান্ডগুলো সহস্রাব্দ ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য পানীয় তৈরি করতে কাজ করে যাচ্ছে। তবে করোনাকালের মতো এত বড় সংকটে পড়েনি রফতানিমুখী এ শিল্প।


ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ চা উৎপাদনকারী ও রফতানিকারক দেশ। পানীয় পণ্যটির বৈশ্বিক রফতানি বাণিজ্যের ১২ দশমিক ৬ শতাংশ জোগান দেয় ভারত। করোনা মহামারীর জের ধরে চলতি বছর উৎপাদন হ্রাসের পাশাপাশি ভারত থেকে পানীয় পণ্যটির রফতানিতেও বড় পতনের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইন্ডিয়ান টি এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (আইটিইএ) বলছে, ভারতে ১ এপ্রিল নতুন অর্থবছর শুরু হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ভারত থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব মিলিয়ে ২৫ কোটি কেজি চা রফতানি হয়েছে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে পণ্যটি রফতানি ২৮ শতাংশ কমে ১৮ কোটি কেজিতে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ভারত থেকে চা রফতানি কমতে পারে সাত কোটি কেজি।

এ বিষয়ে আইটিইএর চেয়ারম্যান অংশুমান কনোরিয়া বলেন, ভারতের চা রফতানি কমার পেছনে করোনা মহামারীর প্রভাব সুস্পষ্ট। লকডাউনের সময় উৎপাদন কমেছে। বাড়তির দিকে রয়েছে দাম। আর সরাসরি এর প্রভাব পড়ছে পানীয় পণ্যটির সামগ্রিক রফতানিতেও।

ভারতে প্রতি বছর গড়ে ১৩০ কোটি কেজির মতো চা উৎপাদন হয়। এর মধ্যে অর্থোডক্স গ্রেডের পরিমাণ ১০ শতাংশেরও কম। প্রতি বছর উৎপাদিত ১১ কোটি কেজি অর্থোডক্স চায়ের প্রায় ৯০ শতাংশ রফতানি করা হয়। চলতি অর্থবছরে অর্থোডক্স চায়ের উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা পানীয় পণ্যটির রফতানি কমাতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে।

অন্যদিকে সিটিসি গ্রেডের চা ভারতের মোট রফতানি হওয়া চায়ের প্রায় ৬০ শতাংশ। গত জুলাই-আগস্টে এ গ্রেডের চায়ের গড় দাম এক বছরের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ১০০-১২০ রুপি বেড়েছে। বাড়তি দাম পানীয় পণ্যটির রফতানি কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে।