ব্যাংকের ‘তারা’-উদ্যোগের মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুতিকে আরো দৃঢ় করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাজধানীর গুলশানের আলোকি কনভেনশন সেন্টারে গতকাল ‘তারা উদ্যোক্তা মেলা ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারপারসন।
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক লীলা রশিদ ও আনিতা গাজী রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তারেক রেফাত উল্লাহ খান এবং অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) ও এসএমই ব্যাংকিং প্রধান সৈয়দ আব্দুল মোমেনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
নারী উদ্যোক্তাদের তৈরি দেশীয় পণ্যের প্রসার ও বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে ব্র্যাক ব্যাংক কর্তৃক চতুর্থবারের মতো তারা উদ্যোক্তা মেলার আয়োজন করা হয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ৮৮ নারী উদ্যোক্তা অংশ নিয়েছেন। এ মেলা ১ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
মেলায় অংশগ্রহণের জন্য উদ্যোক্তাদের কোনো খরচ বহন করতে হয়নি; স্টল বরাদ্দসহ সব ব্যয়ভার বহন করছে ব্র্যাক ব্যাংক।
মেলায় বুটিক, হাতে সেলাই করা পোশাক, কারুশিল্প, জামদানি ও মসলিন, চামড়াজাত পণ্য, অর্গানিক স্কিনকেয়ার এবং বাঁশ-বেতের তৈরি পণ্যের বিশাল সমাহার রয়েছে। এছাড়া মেলায় আগতদের জন্য রাখা হয়েছে ইফতার ও ডিনার ফুড কোর্টসহ অন্যান্য স্টল। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে মেলায় কিউআর কোড এবং কার্ড পেমেন্টের সুবিধা রাখা হয়েছে। কিউআর পেমেন্টে কেনাকাটা করলে ক্রেতারা পাচ্ছেন ২০ শতাংশ পর্যন্ত বিশেষ ছাড়।
মেলায় ঢাকার মিরপুর থেকে অংশ নেয়া ‘চিত্রাঙ্গদা’ স্টলের স্বত্বাধিকারী খাদিজা বলেন, ‘আমাদের ফোকাসড পণ্য হচ্ছে ডিজাইনার ব্লাউজ, যেগুলো আমি নিজেই ডিজাইন করে থাকি। পাশাপাশি শাড়ি ও কুর্তি রয়েছে। সবকিছুই দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি।’
যশোর থেকে আসা উদ্যোক্তা মুসলিমা আক্তার মৌ বলেন, ‘আমরা মূলত স্টিচ নিয়ে কাজ করছি এবং গ্রামীণ নারীদের এগিয়ে রাখাই আমাদের প্রচেষ্টা। দেশীয় সরঞ্জাম ব্যবহার করে তৈরি করা শাড়ি, টু-পিস ও টাই-ডাই স্কার্ফ নিয়ে আমরা মেলায় এসেছি।’
খিলগাঁও থেকে আসা ‘বক্র বাই ঝিল’ স্টলের উদ্যোক্তা বলেন, ‘আমি হোম ডেকর পণ্য নিয়ে এসেছি। এখানে বেডশিট, টেবিল ক্লথ ও কুশন কভারসহ বিভিন্ন কাস্টমাইজড পণ্য পাওয়া যাচ্ছে।’
ক্রেতারাও এক ছাদের নিচে বৈচিত্র্যময় পণ্য পেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ঢাকা সেনানিবাস এলাকা থেকে আসা এক দর্শনার্থী জানান, এ মেলায় এক ছাদের নিচে একসঙ্গে অনেক কিছুই পাওয়া যায়।
আরেকজন নারী ক্রেতা বলেন, ‘এসএমই মেলায় নতুন উদ্যোক্তারা বৈচিত্র্যময় পণ্য নিয়ে আসেন। আমি পরিবারসহ শপিংয়ে বেরিয়ে মেলা দেখে গাড়ি থামিয়েছি এবং এরই মধ্যে দুটি শাড়ি কিনেছি।’
মেলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি ও সিইও তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ‘উন্নয়নের সম-অংশীদার হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংক নারী উদ্যোক্তাদের পূর্ণ সম্ভাবনার বিকাশে সহায়তা করে। এ মেলার মাধ্যমে উদ্যোক্তারা যেমন দেশীয় পণ্যের প্রচারের সুযোগ পাচ্ছেন, তেমনি আর্থিকভাবেও উপকৃত হচ্ছেন। বিশেষ করে ঈদের আগে এ আয়োজন তাদের বিক্রি বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা শুধু অর্থায়ন করি না, এর বাইরে আমরা মার্কেটপ্লেস তৈরিতে সহযোগিতা করি এবং উদ্যোক্তাদের নানাভাবে পরামর্শ দিয়ে থাকি। এর মাধ্যমে একজন উদ্যোক্তার সফলতায় ভূমিকা রাখি। পুরো ভ্যালু চেইনের ভেতরে আমাদের উপস্থিতি থাকে, এটা খুবই সিগনিফিক্যান্ট অ্যান্ড ইমপ্যাক্টফুল। এভাবেই আমরা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যেতে পারব আশা করছি।’ আগামীতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এ ধরনের মেলার আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান ব্র্যাক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী।
ব্র্যাক ব্যাংকের এএমডি ও এসএমই ব্যাংকিং প্রধান সৈয়দ আব্দুল মোমেন বলেন, ‘গত কয়েক বছরে এ মেলা একটা সিগনেচার ইভেন্টে পরিণত হয়েছে। এবার মেলার পরিসর আমরা বাড়িয়েছি। প্রায় ১ হাজার ৯০০ উদ্যোক্তা এ মেলায় অংশ নেয়ার চেষ্টা করেছে, তার মধ্যে নির্বাচিত ৮৮ নারী উদ্যোক্তাকে স্টল দেয়া হয়েছে।’ গত বছর মেলায় সাত হাজার দর্শনার্থী এবং ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছিল। এ বছর মেলা তিনদিন করা হয়েছে। তাই গতবারের চেয়ে বেশি সাড়া পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারপারসন মেহেরিয়ার এম হাসান বলেন, ‘আজ আমরা এখানে সমবেত হয়েছি ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের ভিশন ও আদর্শকে সামনে রেখে, যার অনুপ্রেরণায় ব্র্যাক গড়ে উঠেছে। নারীর ক্ষমতায়ন ছিল তার দর্শনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তাই ব্র্যাকের প্রতিটি কাজের মূলে রয়েছে নারীর অংশগ্রহণ।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য কেবল ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকা নয়; বরং এ মেলা এবং আমাদের সেবাকে দেশের প্রতিটি জেলা ও মফস্বল শহরে ছড়িয়ে দেয়া, যাতে তৃণমূল পর্যায়ের নারী উদ্যোক্তারাও এর সুফল পান।’
ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারপারসন আরো বলেন, ‘৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমরা মাইক্রোফাইন্যান্স ও এসএমই খাতের মাধ্যমে ক্ষুদ্র, কুটির এবং অতিদরিদ্র—অর্থাৎ সেই ‘মিসিং মিডল’ শ্রেণীর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। তবে আমার মনে হয়, উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে আমরা এখনো সেভাবে পৌঁছাতে পারিনি। কেন কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসছে না, কোথায় ঘাটতি রয়েছে—এ প্রশ্নগুলো আমাদের প্রতিটি ক্ষেত্রে করতে হবে। ব্র্যাক ব্যাংককেও এ আত্মোপলব্ধি করতে হবে যে আমরা আসলে কতটা ভূমিকা রাখতে পারছি।’










