বিশ্ব যখন সুদহার বৃদ্ধিসহ উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মন্থর চাহিদার সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে, তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক কার্যক্রম বড় সম্ভাবনার দিকে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছয়টি বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনাম। এইচএসবিসির পূর্বাভাস অনুসারে, উন্নত বিশ্বে ২০২৩ সালে অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ হার ১ দশমিক ১ শতাংশ ও পরের বছর দশমিক ৭ শতাংশ থাকতে পারে। বিপরীত দিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছয় দেশের প্রবৃদ্ধি চলতি বছর ৪ দশমিক ২ শতাংশ ও পরের বছর ৪ দশমিক ৮ শতাংশ সম্প্রসারণ হবে। নিক্কেই এশিয়ায় প্রকাশিত বিশ্লেষণে এমনটাই দাবি করেছেন এইচএসবিসির দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকিংয়ের প্রধান আমান্ডা মারফি।
বৃদ্ধি আরো উল্লেখযোগ্য হয়ে দাঁড়ায়, যখন চীনের পর্যটন ডলারের প্রবাহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রত্যাশিত হারে ফিরে আসছে না। চীনা পর্যটন ব্যবসায়ীদের কাছে সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড উভয়ই জনপ্রিয় গন্তব্য তারপরও পর্যটকদের আগমন প্রাক-কভিড স্তরের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত পুনরুদ্ধার হয়েছে। আগামীতে পর্যটন খাতের পুনরুদ্ধার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য সোনায় সোহাগা হিসেবে দেখা দেবে। তবে এরই মধ্যে বাণিজ্য, কার্বন নিঃসরণ নিট শূন্যে রূপান্তর ও ডিজিটালাইজেশন আগামী কয়েক দশক ধরে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নেবে। পাশাপাশি এ অঞ্চল আগামী দিনে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এখন ম্যানুফ্যাকচারিং ডায়নামো হিসেবে বহুদূর এগিয়েছে। অঞ্চলটি এখন বিশ্বব্যাপী রফতানি বাণিজ্যের ৮ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে ২০২০ সাল থেকে চীনের বৃহত্তম ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও ছাড়িয়ে গেছে। অঞ্চলটি বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্গঠন থেকে লাভবান হচ্ছে। কারণ অঞ্চলটি বিশ্বের দুটি বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) ও কম্প্রিহেনসিভ অ্যান্ড প্রগ্রেসিভ অ্যাগ্রিমেন্ট ফর ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপে সই করেছে।
শুল্ক হ্রাস ও ব্যবসাবান্ধব নিয়মকানুনের সুবিধা থাকায় আরসিইপি উৎপাদনভিত্তিক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তার আবেদন বাড়িয়ে তুলছে। ফলে অন্যান্য কোম্পানিও এতে যুক্ত হওয়ার জন্য আগ্রহী হচ্ছে। এইচএসবিসির সাম্প্রতিক সমীক্ষায়, এশিয়া-প্যাসিফিক কোম্পানিগুলো আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের সরবরাহ চেইনের ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে, যা ২০২০ সালের হিসাব থেকে ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।
যত বেশি কোম্পানি বৈচিত্র্য আনতে চীন প্লাস ওয়ান উৎপাদন কৌশলে যুক্ত হবে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তত বেশি মার্কেট শেয়ার লাভ করবে। বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র দক্ষিণ এশিয়ার দিকে স্থানান্তর হতে শুরু করায় আরো বেশি প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ এ অঞ্চলে আসবে। কার্বন নিঃসরণ নিট শূন্যে রূপান্তর দ্বিতীয় কাঠামোগত প্রবণতা, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কাঠামোকে পরিবেশবান্ধব করে তুলবে।
সাধারণত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার ফলে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া একটি। তবুও এ অঞ্চলের উন্নয়নে জ্বালানির চাহিদা হু হু করে বাড়ছে। আশঙ্কাজনক তথ্য হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশির ভাগ জ্বালানি চাহিদা মেটানো হয় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকেই। এ অঞ্চলের সবচেয়ে গতিশীল অর্থনীতির দুই দেশ ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম বিশ্বের শীর্ষ কয়লা পোড়ানো দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু আশার খবর হচ্ছে দেশ দুটি গ্রুপ অব সেভেনসহ অন্য উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন পার্টনারশিপ ঘোষণা করেছে। ফলে সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়নে কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে দুই দেশের বিদ্যুৎ খাতে ডিকার্বনাইজেশন ঘটাবে এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে রূপান্তর পদক্ষেপকে এগিয়ে নেবে।










