রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয় গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে। এর প্রতিবাদ হিসেবে বা রাশিয়াকে রুখতে দেশটির ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে পশ্চিমা বিশ্ব। রাশিয়া যেন জ্বালানি পণ্য রফতানি করতে না পারে, সেজন্যও নানা পদক্ষেপ নেয় ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বমোড়ল হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র। এক্ষেত্রে যুক্তি ছিল রাশিয়া যেহেতু জ্বালানি বিক্রির অর্থ দিয়েই যুদ্ধ পরিচালনা করছে, তাই সে আয়ই কমিয়ে দিতে হবে। ফলে ধারণা করা হয়েছিল গত বছর রাশিয়ার অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য সংকোচনের মুখে পড়বে। কিন্তু বছর শেষে দেখা গেছে, প্রত্যাশার চেয়ে সংকোচনের পরিমাণ কম।
রাশিয়ার পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্যানুযায়ী, গত বছর রুশ অর্থনীতি ২ দশমিক ১ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। যদিও গত বছর ১২ শতাংশ সংকোচনের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল।
এদিকে নতুন পরিসংখ্যানের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাশিয়ার অর্থনীতির এ স্থিতিস্থাপকতা অনেক বিশ্লেষককেই অবাক করেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য ও সামরিক বাহিনীর ব্যয়ই রাশিয়ার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছে।
উল্লেখ্য, গত বছর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হলে অসংখ্য পশ্চিমা কোম্পানি রাশিয়া থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়। হঠাৎ এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় অস্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে হয় রাশিয়ার পুঁজিবাজারের কার্যক্রম। আতঙ্কিত জনগণ এটিএম মেশিন থেকে নগদ অর্থ তুলে নিতে শুরু করে, পতনের মুখে পড়ে রুবলের মান।
দি ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স এক পূর্বাভাসে বলেছিল, ২০২২ সালে রাশিয়ার অর্থনীতি ১৫ শতাংশ সংকাচনের মুখে পড়বে। তবে যেমনটা ভাবা হয়েছিল তেমনটা হয়নি। গত বছর তেল রফতানি অব্যাহত রেখেছিল রাশিয়া। তেল রফতানিতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা গত বছর ধীরে ধীরে কার্যকর হয়েছে। ওই সময় ইউরোপে আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। কিন্তু চীন, ভারতের মতো কিছু স্থিতিশীল ক্রেতা থাকায় তেল বিক্রি বন্ধ থাকেনি।
রাশিয়ার অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত সংকোচন না হওয়ার পেছনে আরো বেশকিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম তেল, গ্যাস ও পেট্রোলিয়ার পণ্যের মতো বিভিন্ন পণ্য, যেগুলো রাশিয়া রফতানি করে, সেগুলোর দাম বৈশ্বিকভাবেই বেড়ে যাওয়া। এর মধ্যে রয়েছে কিছু খাদ্যপণ্য ও সার।
শতাধিক কোম্পানি রাশিয়া থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিলেও স্থানীয় উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। যেমন ম্যাকডোনাল্ড যখন রেস্তোরাঁগুলো বিক্রি করে দিল, তখন তা কিনে নেন স্থানীয় এক ব্যবসায়ী। ‘টেস্টি অ্যান্ড দ্যাটস ইট’ নামে এখন সে ব্যবসা পরিচালনা করছেন তিনি। তবে এটা ঠিক, উৎপাদন ও খুচরা পর্যায়ের অনেক ব্যবসার জন্য ২০২২ সাল বেশ খারাপ গেছে। তবে রাশিয়ার ফেডারেল স্ট্যাটিসটিকস সার্ভিসের তথ্য বলছে, কৃষি, নির্মাণ ও পরিষেবা খাত উন্নতি করেছে। এছাড়া দেশটির সামরিক বাহিনীর জন্য বিভিন্ন সামগ্রী উৎপাদনও রুশ কারখানাগুলো সচল রেখেছে। যার কারণে গত বছর গাড়ি উৎপাদনের চেয়ে বেড়েছে অস্ত্র তৈরি। সামরিক নিরাপত্তা ও সরকারি প্রশাসনিক খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১ শতাংশ। এসব কর্মকাণ্ডও দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে, এগিয়ে নিয়ে গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে যে নিষেধাজ্ঞাগুলো দেয়া হয়েছিল, সেগুলো তেমন শক্ত বা নিশ্ছিদ্র ছিল না। রাশিয়াকে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের চেয়ে ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য ছিল কীভাবে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া যায়, কীভাবে অর্থ লেনদেন করা যায়। এজন্য অর্থ লেনদেনে এমন দেশগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে, যারা নিষেধাজ্ঞায় অংশ নেয়নি, এমনকি ক্রিপ্টোকারেন্সিও ব্যবহার করা হয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা যে কোনো প্রভাবই ফেলতে পারেনি, সেটি বলা যাবে না। বরং নিষেধাজ্ঞার কারণে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যার প্রভাব রয়ে যাবে বহুদিন। যেমন নিষেধাজ্ঞার কারণে উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য যেমন মাইক্রোচিপস সরবরাহ দারুণ সংকটের মুখে পড়েছে। রাশিয়ার বিভিন্ন জরুরি প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনে যেসব চিপ প্রয়োজন হয় তার মূল জোগানদাতা ছিল মার্কিন কয়েকটি কোম্পানি। নিষেধাজ্ঞার ফলে চিপ সংকট সবচেয়ে বেশি বিপাকে ফেলেছে রাশিয়াকে। সে কারণেই বলা হচ্ছে, নিষেধাজ্ঞার এ প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হবে।










