নভেম্বরে ইউরোজোনের মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত কমেছে। ইউরো ব্যবহারকারী দেশগুলোয় এক বছর আগের তুলনায় দাম ২ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। নিম্নমুখী এ প্রবণতার জন্য জ্বালানিশক্তি ও খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস প্রভাব রেখেছে। খবর দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতির হার গত নভেম্বরে দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে। এটি পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত নিচে নেমেছে। উচ্চ সুদহার এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর জ্বালানি ও খাদ্যের দাম কমানোর প্রচেষ্টার ফলে মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী। এটি ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের পরবর্তী সভায় সুদহার স্থিতিশীল রাখার পক্ষে মতামত তৈরি করেছে।

পরিসংখ্যান সংস্থা জানায়, ইউরোজোনের ২০টি দেশের মূল্যস্ফীতি এক বছর আগের তুলনায় নভেম্বরে কমেছে। অক্টোবর পর্যন্ত আগের ১২ মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ।

ভোক্তারা মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো অনুভব করছেন। মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় ব্যবহৃত উচ্চ সুদহার জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো প্রধান অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে ধীর করেছে, যা সর্বোপরি ইউরোপের অর্থনীতিকে ধীর করেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এগিয়ে চলেছে।

জ্বালানির দাম গত বছরের তুলনায় ১১ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সময় স্বল্প জ্বালানি সরবরাহের কারণে জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছিল। খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।

অস্থিতিশীল খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাদ দিলে প্রকৃত মূল্যস্ফীতি বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এটি পূর্ববর্তী মাসগুলোর তুলনায় তীব্র মন্দার প্রমাণ দেয়।

ফ্রান্স, জার্মানি এবং স্পেনের সরকার খাদ্য ও জ্বালানি বিল কমাতে কাজ করছে। তাদের লক্ষ্য ছিল ভোক্তাদের সহায়তা করা। বেলজিয়ামে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো জিনিসপত্রের দাম কমেছে।

আইএনজি ব্যাংকের ইউরোজোনের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ বার্ট কোলিজন জানান, মূল্যস্ফীতি পূর্বাভাসের চেয়েও দ্রুত কমেছে। এ থেকে বোঝা যায়, মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের কৌশল কাজে লেগেছে।

জার্মান মূল্যস্ফীতি বছরওয়ারি প্রত্যাশার চেয়ে ২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থনীতির সব খাতে মূল্যস্ফীতির চাপ কমেছে। সরকার গৃহস্থালি খাদ্য ও জ্বালানি ক্ষেত্রে ভর্তুকি দিয়ে আসছে। তবে শিগগিরই এ ভর্তুকি কর্মসূচি বন্ধ হতে পারে।

স্পেনে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার নভেম্বরে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে। সস্তা জ্বালানি ও পর্যটনে বড় আকারে ছাড় একটি প্রধান প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হতে পারে।

ইউরোস্ট্যাট জানায়, গত বছরের তুলনায় নভেম্বরে ফ্রান্সের মূল্যস্ফীতি ৩ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা চলতি বছরের অক্টোবরে ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

ফ্রান্সের অর্থনীতিমন্ত্রী ব্রুনো লে মাইরে এক সাক্ষাৎকারে জানান, দুই বছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আনা সত্যিকারের সাফল্য। ১৯৭০-এর দশকে যা অর্জন করতে ১০ বছর লেগেছিল। উচ্চ সুদহার ও দুর্বল বিনিয়োগের কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়েছে।

ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্তিন লাগার্দ জানান, গত মাসে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমেছে। তবে দাম আরো কিছুদিন বেশি থাকবে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির অভ্যন্তরীণ চাপ এখনো প্রবল।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকায় মূল্যস্ফীতি রোধে ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক ২০২২ সালের জুলাই থেকে সুদহার বাড়িয়েছিল। সুদহার শূন্য থেকে এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। 

কিন্তু ইউরোপ দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন। উচ্চ সুদহার ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চলমান প্রভাবে অর্থনৈতিক কার্যক্রম মন্থর হয়েছে। এ মন্দা ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। গত মাসে তারা অর্থনীতি গতিশীল করতে নতুন করে সুদহার বাড়াননি।

নীতিনির্ধারকরা এখন মূল্যস্ফীতিকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনতে উচ্চ সুদহার কতদিন ধরে রাখা যায় সেদিকে মনোনিবেশ করছেন। তারা এখনো মজুরি বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য জ্বালানি বাজারের ঊর্ধ্বগতি সম্পর্কে উদ্বিগ্ন। এ দুটো মূল্যস্ফীতিকে আবার বাড়িয়ে তুলতে পারে। কিছু ব্যাংক আশা করছে, ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক আগামী গ্রীষ্মের আগে সুদহার কমানো শুরু করবে।