ছোট ছোট আইলে খণ্ডিত জমি। কৃষকের আর্থিক সামর্থ্যও সীমিত। ফলে আধুনিক যন্ত্র ব্যবহারের জো নেই। একেকজন ভিন্ন জাত ও ফসল চাষের সিদ্ধান্ত নেয়ায় ফলনও হচ্ছে কম। এতে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। বছরের পর বছর ধরে সনাতনী পদ্ধতিতে চলছে দেশের কৃষি উৎপাদন। ফলে বাড়ছে কৃষকের খরচ, কমছে শস্যের নিবিড়তা ও উৎপাদনশীলতা। বাড়তি উৎপাদন খরচ ও উন্নত প্রযুক্তির সম্প্রসারণে বাধার কারণে মুনাফা হচ্ছে না কৃষকের। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, কৃষকের আগ্রহ কমে যাওয়া ও যথাযথ পরিচর্যার অভাবে কমে যাচ্ছে হেক্টরপ্রতি উৎপাদনশীলতা। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও ব্যয় কমিয়ে আনার চিন্তা থেকে সরকার সম্প্রতি একটি উদ্যোগ নিয়েছে, যার নাম দেয়া হয়েছে ‘সমলয়’। এ প্রক্রিয়ায় জমির আইল ব্যবস্থা না তুলে আধুনিক যন্ত্রপাতি, সার-বীজ ও পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে অধিক উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েকটি এলাকায় পাইলটিং করে আশাব্যঞ্জক সাফল্য পাওয়া গেছে। সরকার ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার সংশ্লিষ্ট একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এ কার্যক্রমে সহজে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষকদের অধিক ফলন ঘরে তোলা সম্ভব। এজন্য কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক সব ব্যয় বহন করে বীজ বপন থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত কৃষি অধিদপ্তর কাজ করবে।
গত কয়েক দশকের ব্যবধানে দেশের কৃষি খাতে উৎপাদনশীলতা স্থবির হয়ে পড়ার বড় কারণ জমির খণ্ড-বিখণ্ডতা। সাধারণত জমির মালিকানা পরিবর্তিত হয় বাজার ব্যবস্থাপনা ও জমির উৎপাদনশীলতার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বাংলাদেশে উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিকানা পরিবর্তনের কারণে মানুষ জমিকে সঞ্চয় হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর চেয়ে জমির ভাড়া প্রদানের মাধ্যমে আয়ে বেশি মনোযোগ থাকে। জমি ছোট হওয়ার কারণে উৎপাদনশীলতাও কমছে এবং উপকরণের দাম বাড়ছে। ফলে কৃষকের খরচও বাড়ছে। ছোট জমিতে যান্ত্রিকীকরণসহ আধুনিক ব্যবস্থার প্রয়োগ সম্ভব হচ্ছে না। এতে উৎপাদনশীলতা কমছে। এ অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন প্রয়োজন। সেটি করতে হলে ভূমি সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু এখানকার ভূমি প্রক্রিয়া এত জটিল আকার ধারণ করেছে যে সমবায় পদ্ধতির প্রয়োগ এখানে কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষত ক্ষুদ্র কৃষকরা শঙ্কায় থাকেন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার। এমন প্রেক্ষাপটে আইল রেখে ব্যয় কমিয়ে উচ্চফলনশীল জাত চাষ ও আধুনিক উপকরণ-যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে অধিক উৎপাদনের জন্যই সমলয় পদ্ধতির সৃষ্টি। ‘সমলয়’ পদ্ধতিতে সবাই মিলে একটি ব্লকে/মাঠে একসঙ্গে একই জাতের ধান একই সময়ে যন্ত্রের মাধ্যমে রোপণ করা হয়। বীজতলা থেকে কর্তন, সব প্রক্রিয়া যন্ত্রের সাহায্যে সমসময়ে সম্পাদন করা হয়। এ পদ্ধতিতে ধান আবাদ করতে হলে চারা তৈরি করতে হয় ট্রেতে। ট্রেতে চারা উৎপাদনে জমির অপচয় কম হয়। রাইস ট্রান্সপ্লান্টার দিয়ে চারা একই গভীরতায় সমানভাবে লাগানো যায়। কৃষক তার ফসল একত্রে মাঠ থেকে ঘরে তুলতে পারেন। কারণ একসঙ্গে রোপণ করায় সব ধান পাকবেও একই সময়ে। তখন ধান কাটার মেশিন দিয়ে একই সঙ্গে সব ধান কর্তন ও মাড়াই করা যাবে। এসব কারণে সমলয় পদ্ধতিতে যন্ত্রের ব্যবহার সহজতর হবে। ফলে ধান চাষে সময়, শ্রম ও খরচ কম লাগবে, তেমনি উৎপাদনও হবে বেশি। এতে কৃষকরা লাভবান হবেন।
দেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের প্রধান অন্তরায় প্রান্তিক কৃষকের কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের অনুপযোগী ছোট কৃষিজমি, যেখানে মানসম্মত কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যায় না। দেশের প্রান্তিক কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবেও অসচ্ছল। তাদের উচ্চমূল্যে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের সামর্থ্য নেই। এছাড়া ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু বিশ্বজুড়ে যে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার প্রসার ঘটেছে তার মূলে রয়েছে যান্ত্রিকীকরণ। জাপান, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষিকাজে রোবট, ড্রোন, সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিচালিত যন্ত্রের ব্যবহার এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। তাই কৃষিতে ব্যয় কমিয়ে উৎপাদন বাড়াতে হলে যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। সমলয়ের মাধ্যমে সরকার কৃষকদের গ্রুপ করে চাষাবাদের জন্য সহায়তা প্রদান করছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উপকরণ কিনতে সরকার ভর্তুকি দেবে। সমন্বিত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করায় ফলনও বাড়বে। আবার জমির আইল ব্যবস্থা অপরিবর্তিত থাকায় কৃষকের আস্থাও মিলছে। আইনি জটিলতাও এক্ষেত্রে নেই বললে চলে। উদ্ভাবিত পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ নিজস্ব হওয়ায় এক্ষেত্রে ঝুঁকি কম বলে খবর মিলছে, যা আশাব্যঞ্জক।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বড় কৃষকদের প্রতি পক্ষপাত নেয়ার ঝোঁক লক্ষণীয়। সত্তর ও আশির দশকে ভারতের পাঞ্জাব ও অন্যান্য রাষ্ট্রে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের প্রভাব খতিয়ে দেখা হয়েছে। তাতে গ্রামীণ আয়বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে। বাংলাদেশে বড় কৃষকদের সংখ্যা খুবই কম। ছোট ও মাঝারি কৃষকের সংখ্যা বেশি। তাদের আর্থিক সমর্থন দিয়ে যন্ত্রের মালিক করা হলে গ্রামীণ আয়বৈষম্য কমতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। তাছাড়া কৃষি যান্ত্রিকীকরণে খুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রসার ঘটানো হলে যন্ত্রপাতি মেরামতসহ বিভিন্ন কাজে কর্মসংস্থান বাড়বে। এর জন্য বাজেটারি সহায়তা প্রয়োজন।
মানুষ বাড়ছে, জমি কমছে, বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য জোগান দিতে হলে নতুন জাত, ভালো বীজ এবং উন্নত প্রযুক্তি দ্রুত মাঠে নিয়ে যেতে হবে। আর ফলন বাড়াতে সমলয় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করছে মাঠপর্যায়ের তদারকির ওপর। বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ হলেও কৃষি সেক্টর কৃষি যান্ত্রিকীকরণের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। কৃষি যন্ত্র ব্যবহারে কৃষকদের ফসল উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা ফসল থেকে আর একটা ফসল লাগানোর মধ্যবর্তী সময় কমে আসবে। এতে কৃষকরা বছরে দুটি ফসলের স্থানে তিনটি ফসল অনায়াসেই করতে পারবেন। এমনকি সুনির্দিষ্ট শস্যবিন্যাস ও স্বল্প জীবত্কালের ফসল নির্বাচন করে যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে বছরে চারটি ফসল পর্যন্ত করা সম্ভব।









