বিশ্বব্যাপী জ্বালানিপণ্যের বাজার এখন অস্থিতিশীল। সারসহ কৃষি উপকরণের বাজারও ব্যাপক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো বাংলাদেশেও কৃষি উৎপাদনের খরচ আগের চেয়ে বেড়েছে। কৃষকের জন্য উচ্চ উপকরণ ব্যয় মিটিয়ে চাষাবাদ কঠিন হয়ে পড়ছে। শ্রমিক মিলছে না, আবার যান্ত্রিকীকরণে ব্যয়ও বেড়েছে। অন্যদিকে অর্থ দিয়ে বিশ্ববাজার থেকেও প্রয়োজনীয় খাদ্য মিলছে না। ফলে সরকার ও বিশেষজ্ঞরা অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করছেন। এক্ষেত্রে কৃষকের হাতে যথাসময়ে পর্যাপ্ত অর্থ পৌঁছে দেয়া জরুরি। দেশের কৃষি এখন প্রান্তিক কৃষকের ওপর নির্ভরশীল, যাদের আবার নিজস্ব পুঁজি নেই বললে চলে। এ অবস্থায় কৃষি উৎপাদনের জন্য কৃষকের অর্থায়ন বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন নিঃসন্দেহে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তবে এর সাফল্য নির্ভর করছে উপযুক্ত ব্যক্তির হাতে যথাসময়ে অর্থ পৌঁছানোর ওপর। প্রত্যাশা থাকবে তদারকি জোরদারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক যথাযথ ভূমিকা রাখবে এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।
দেশের
ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ঋণ পরিশোধের
দিক থেকে কৃষি খাতের
পারফরম্যান্স ভালো।
খাতভিত্তিক ঋণ বিতরণের অনুপাতে
আদায়ের হারের
দিক থেকে কৃষির অবস্থান
প্রতি বছরই শীর্ষে। এমনকি
কভিডের প্রাদুর্ভাবজনিত অর্থনৈতিক দুর্বিপাকের মধ্যেও
কৃষি খাত থেকে ঋণের অর্থ আদায় হয়েছে বিতরণের
চেয়ে বেশি।
দুঃখজনক হলেও সত্য, গ্রাহক
হিসেবে কৃষক সেরা হলেও এখনো দেশের
কৃষি জিডিপির
বিপরীতে কৃষি ঋণের হার ১০ শতাংশেরও
নিচে। বাংলাদেশ
ব্যাংক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে, সেটা অধিকাংশ ব্যাংক
যথাযথ পালন করে না। ঋণ পেতে প্রান্তিক কৃষককে
হয়রানির শিকার
হতে হয়। কাগজপত্রকেন্দ্রিক জটিলতার
সৃষ্টি হয়। কৃষির ক্ষেত্রে
বড় সমস্যা
হলো, যথাসময়ে
ঋণ না পেলে চাষ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে
কৃষক ফসল বিক্রি করা ছাড়া দিতে পারেন না। বিষয়গুলো বিবেচনায়
রেখে কৃষি ঋণ বিতরণ
ও আদায়ের
সময় নির্ধারণ
করা প্রয়োজন।
বাজেটে সরকার
কৃষিতে যে বরাদ্দ দিয়ে আসছে তা পর্যাপ্ত বলা যায় না। দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য কৃষি উৎপাদন
অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে
রাখাও সহজ হবে। তাই সার, বীজ, কৃষি যন্ত্রাংশসহ সার্বিক কৃষি খাতে বাজেটে বরাদ্দ
বাড়াতে হবে। এর পাশাপাশি
অকৃষি খাতেও
যাতে বিনিয়োগ
উৎসাহিত হয় সে বিষয়েও
গুরুত্ব দিতে হবে। গ্রামে
যেসব কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠছে যেমন পোলট্রি,
দুধ, মাংস, ফল ইত্যাদি
প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা
গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সরকার
খুব বেশি সহায়তা দিচ্ছে
এমনটি চোখে পড়ে না। অথচ এ সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানো গেলে খাদ্যনিরাপত্তা যেমন বাড়বে তেমনি
কর্মসংস্থানের একটি বড় সুযোগ
তৈরি হবে। তবে সবার আগে গঠিত তহবিলের সর্বোচ্চ
সদ্ব্যবহার নিশ্চিত
করতে হবে। এর আগে গঠিত ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিলের
অর্থ নির্ধারিত
সময়ের মধ্যে
বিতরণ করা যায়নি। পরবর্তী
সময়ে বাড়িয়ে
তা বিতরণ
করা হয় এবং কৃষক অভিযোগ করেছিল
যে সময়ে তাদের অর্থ প্রয়োজন সে সময়ে তারা সেটি পাননি।
আর হয়রানি
ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অভিযোগ তো রয়েছে। এবার যেন তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
দেশে জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, সে হারে কৃষি খাতের উৎপাদন বাড়ছে না। এর পেছনে বড় একটি কারণ হিসেবে খাতটির অপ্রতুল ঋণপ্রবাহের সমস্যাকে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অভিজ্ঞতায় কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে ঋণের ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর রিসার্চ অন ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক রিলেশনসের (আইসিআরআইইআর) এক গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতে কৃষি ঋণের প্রবাহ প্রতি ১ শতাংশ বাড়ার সঙ্গে কৃষি খাতের মোট জিডিপি বেড়েছে প্রায় দশমিক ৩ শতাংশ। গত কয়েক দশকে দেশটির কৃষি খাতে জিডিপির বিপরীতে ঋণের অনুপাত ক্রমেই বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। আশির দশকের শেষ দিকেও দেশটিতে এ অনুপাতের গড় ছিল ১৭ শতাংশ। ২০১৭ সালের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে। এ সময় দেশটিতে কৃষি খাতের উৎপাদন বেড়েছে ২৬ গুণ। বাংলাদেশে এ-সংক্রান্ত গবেষণা না হলেও কৃষির উৎপাদনের সঙ্গে অর্থায়নের ইতিবাচক সম্পর্কই পাওয়া যায়। কৃষি খাতের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষুদ্র কৃষকের উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধি। তাদের জন্য উৎপাদন পদ্ধতির আধুনিকায়ন ও বাজারকে লাভজনক করতে উৎপাদনসংশ্লিষ্ট প্রতিটি স্তরেই সহায়তার প্রয়োজন পড়ে। এমনই এক কার্যকর সহযোগিতা হলো কৃষকের সহজ অর্থায়ন। ভ্যালু চেইনের প্রতিটি পর্যায়ে স্বল্প সুদে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের সুযোগ থাকলে ক্ষুদ্র কৃষকের পক্ষে উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধির পথে অনেক বাধাই দ্রুত মোকাবেলা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে প্রান্তিক চাষীকে বাণিজ্যিক কৃষকে রূপান্তরের পথও অনেকটাই মসৃণ হয়ে ওঠে। এতে তাদের পক্ষে কৃষির অন্য যেসব উপখাতে ভূমির চেয়ে মূলধনের প্রয়োজনীয়তা বেশি (যেমন ডেইরি, পোলট্রি, মত্স্য, মৌচাষ ইত্যাদি) সেসব উপখাতেও উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয়।
কৃষিতে
ঋণের প্রবাহ
বাড়াতে বিভিন্ন
সময়ে বিভিন্ন
উদ্যোগ নিয়েছে
বাংলাদেশ ব্যাংক।
যদিও এসব উদ্যোগে সফলতা
মিললেও কৃষিতে
ঋণপ্রবাহ বাড়ানোয়
তা তেমন কোনো ভূমিকা
রাখতে পারেনি।
এর একটি বড় উদাহরণ
হলো আমদানিনির্ভর শস্য উৎপাদনে রেয়াতি
সুদে ঋণ কর্মসূচি। ডাল, মসলা, তেলবীজ,
ভুট্টাসহ আমদানিনির্ভর বিভিন্ন শস্য উৎপাদনে
কৃষককে সুবিধা
দিতে এ কর্মসূচি চালু হয় প্রায়
দুই দশক আগে। বিশেষ
এ ঋণ কর্মসূচি সাফল্যও
পেয়েছে বিপুল।
যদিও সাফল্যের
মাত্রা অনুযায়ী
বিশেষ এ প্রকল্পের পরিসর
ও অবয়ব বড় হয়নি।
রেয়াতি সুদে নেয়া ঋণের অর্থ কৃষক শস্য উৎপাদনে
ব্যয় করছেন।
পরবর্তী সময়ে উৎপাদিত শস্য বিক্রি করে যে মুনাফা
হচ্ছে, সেটি থেকেই ঋণের অর্থ পরিশোধ
করছেন কৃষক।
যদিও বিশেষ
এ তহবিল
থেকে দেয়া ঋণ লক্ষ্যমাফিক শস্য উৎপাদনে যথেষ্ট
নয়। প্রতি
বছরই দেশের
কৃষি ও কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নে ঋণ নীতিমালা ঘোষণা
করছে বাংলাদেশ
ব্যাংক। নির্দিষ্ট
অংকের ব্যাংকঋণ
নিশ্চিতের পাশাপাশি
কৃষকের জন্য বিভিন্ন বিশেষ
প্রণোদনা ও রেয়াতি সুদের
পুনঃঅর্থায়ন তহবিলও
ঘোষণা করা হচ্ছে। কৃষকের
স্বার্থ রক্ষায়
কৃষিতে বড় অংকের ভর্তুকিও
দিচ্ছে সরকার।
যদিও ঋণের প্রয়োজনমাফিক প্রবাহ
না থাকায়
এসব নীতির
কার্যকর সুফল পাওয়া যাচ্ছে
না। বিষয়টি
খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা
নেয়া প্রয়োজন।
অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়েছে বাংলাদেশ
ব্যাংকের তহবিলের
একটি বড় অংশ অব্যবহূত
থেকে যায়। ঋণ বিতরণকারী
কর্তৃপক্ষ ও ব্যাংকের উদাসীনতার
কারণে এমনটি
হয়ে থাকে বলে বিভিন্ন
গবেষণায় উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে
তহবিল গঠনের
পাশাপাশি সেটি যেন সঠিক ব্যক্তির হাতে যথাসময়ে পৌঁছায়,
তা নিশ্চিত
করতে বাংলাদেশ
ব্যাংকের তদারকিও
জোরদার করতে হবে। ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধে কৃষক যেন হয়রানির
শিকার না হন এবং সর্বোচ্চ শিথিলতার
সঙ্গে এটি দেখভাল করা হয়, সেটিও
পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে ভূমিকা রাখলেও কৃষক বরাবরই বঞ্চিত ও উপেক্ষিত থেকেছেন। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যেসব নীতি নেয়া হয়, তার সুফল প্রান্তিক কৃষকের কাছে পৌঁছে না। এতে আর্থিকভাবে তারা সচ্ছলও হতে পারছেন না। কৃষিঋণ বিতরণের চেয়ে আদায় বেশি হওয়া মানে এর উদ্বৃত্ত অংশ অন্য খাতে দেয়া হচ্ছে। এজন্য ব্যাংকের অর্থায়ন সুবিধাগুলোও বাড়াতে হবে। এছাড়া কৃষি উপকরণের ক্ষেত্রে একটা সার্বিক মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে এটা খেয়াল রাখতে হবে যেন তা মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে চলে না যায়। আবার উপকরণের বাজারে যে নিয়ন্ত্রক রয়েছে, তা নিয়েও ভাবতে হবে। বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বে খাদ্য সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কৃষি উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক গঠিত তহবিল উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা।










