বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইন-২০০৩ সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।  এতে বলা হয়েছে, ‘এ আইনের অন্যান্য বিধানে যা কিছু থাকুক না কেন, বিশেষ ক্ষেত্রে সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে ভর্তুকি সমন্বয়ের জন্য জনস্বার্থে কৃষি, শিল্প, সার, ব্যবসা-বাণিজ্য ও গৃহস্থালি কাজের চাহিদা অনুযায়ী এনার্জির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে এসবের উৎপাদন, এনার্জি সঞ্চালন, মজুদকরণ, বিপণন, সরবরাহ, বিতরণ এবং ভোক্তা ট্যারিফ নির্ধারণ, পুনর্নির্ধারণ বা সমন্বয় করতে পারবে।’ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় কোনো শুনানি ছাড়াই ডিজেল, অকটেন, কেরোসিন ও পেট্রলসহ জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করে আসছে। এটি ছিল আইনের ব্যত্যয়। তবে অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হতো। কারণ বিইআরসি গণশুনানি করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য সমন্বয় করত। ভোক্তা ও কোম্পানি উভয়ের যুক্তি উপস্থাপন, তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতো। শুনানির মাধ্যমে দাম নির্ধারিত হওয়ায় মানুষ কিছু তথ্য জানা ও বোঝার সুযোগ পেত। আইন সংশোধনের মাধ্যমে সেটি সংকুচিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। সর্বোপরি জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি আরো বাড়বে।

আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপে ১৯৯৬ সালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেয় সরকার। এ সংস্কারের অন্যতম ছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা তৈরি করা, যারা সরকারের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রচণ্ড চাপেই ২০০৩ সালে বিইআরসি আইন প্রণয়ন করা হয়। বহুদিন এর কার্যক্রমে গতি আসেনি। কারণ সরকার একে ক্ষমতায়িত করেনি, প্রয়োজনীয় লোকবলও প্রদান করেনি।

২০০৭ সালে বিইআরসি প্রথম অফিস পায়। ২০০৮ সালে প্রথম বিইআরসি গণশুনানির আয়োজন করে। তাদের অর্গানোগ্রাম থেকে শুরু করে অর্থায়ন সবকিছুই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় অনুমোদন দেয়া হয়। ২০০৮ সালের আগে সরকার বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি তেলসহ সব জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণ করত এবং এটি করা হতো একটি ঘোষণার মাধ্যমে। সেখানে জনগণের কোনো অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না। জনগণও কোম্পানিগুলোর হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে কোনো কিছুই জানতে পারত না। বিশ্বের অন্যান্য দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জ্বালানি তেল আমদানি ও বিক্রি করে থাকলেও বাংলাদেশে একটি মাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান তেল আমদানি ও তাদের অধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তা বিক্রি করছে। অর্থাৎ দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে সরকারের নিয়ন্ত্রণ একক। জ্বালানি তেলের একক মূল্য নির্ধারণের পেছনে সরকারের যুক্তি ছিল মূলত দুটি। এক. বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি তেলের একক আমদানিকারক এবং দুই. জ্বালানি তেলে সরকার ভর্তুকি দেয়। ফলে বিপিসির কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আসেনি। কিন্তু বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমে কিছুটা হলেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনতে পেরেছে বিইআরসি। আর এটি সম্ভব হয়েছে গণশুনানির মাধ্যমে দাম নির্ধারণের কারণে। বিইআরসি আইন সংশোধনের মাধ্যমে সরকার আবার ২০০৮ সাল-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যাওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে, যা হতাশাজনক। এতে বিইআরসির ক্ষমতা খর্ব হবে, মানুষও আগের মতো জ্বালানিপণ্যের দাম নির্ধারণ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভ করবে না।

বিইআরসি খুবই শক্তিশালী একটি প্রতিষ্ঠান। তারা চাইলে আইনবলে সরকারকেও নির্দেশনাও দিতে পারে। কিন্তু তারা সে ক্ষমতা প্রয়োগ করেনি। বিশ্বের অনেক দেশেই দেখা গিয়েছে এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন করে। অনেক সময় সরকারের সিদ্ধান্ত বাতিল করার অধিকারও রাখে। অধিকাংশ উন্নত দেশে এবং অনেক অনুন্নত দেশেও জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণ থেকে শুরু করে তাদের হিসাব-নিকাশ দেখভাল করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সরকারসহ বাজারে যেসব কোম্পানি ভোক্তাদের সেবা প্রদান করে তারা আইনের ব্যত্যয় ঘটালে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সেটা শোধরানোর ব্যবস্থা নেয়। এতে করে একটি শক্তিশালী দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়া গড়ে ওঠে, যা বাংলাদেশেও গড়ে ওঠে। বিইআরসি সে পথে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছিল। যদিও বিইআরসি সরকারের মতের বাইরে দাম নির্ধারণ করেছে বলে খবর মেলে না। অর্থাৎ বিইআরসির আরো ক্ষমতায়ন দরকার।

সরকার এখন ব্যক্তি খাতকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানির অনুমতি দেয়ার চিন্তা করছে বলে শোনা যাচ্ছে। সরকার ও ব্যক্তি খাত উভয়ই জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানি করলে তাদের মধ্যে সমন্বয়ের জন্য বিইআরসির মতো প্রতিষ্ঠান দরকার। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে একমাত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থাই সবার জন্য একই নিয়ম-কানুন নিশ্চিত করতে পারে। না হলে সরকার চাইলে নতুন নিয়ম বা দাম নির্ধারণের মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিযোগীদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি সেবাপ্রদানকারী সংস্থার অতি মুনাফা অর্জন থেকে ভোক্তাদের রক্ষা করতে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা দরকার। অর্থাৎ ভোক্তা ও ব্যবসায়ী উভয়েরই স্বার্থ রক্ষার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা একটি বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু বর্তমানে আইন সংশোধনের মাধ্যমে বিইআরসি ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়বে।

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের স্বচ্ছভাবে দাম নির্ধারণে বিআইআরসি বড় ভূমিকা রাখছে। আইন সংশোধনের মাধ্যমে সেটি খর্ব করা হলে তা হবে আত্মঘাতী ও ক্ষতিকর। অনেকে হয়তো বলবেন, এলপি গ্যাসের দাম বিইআরসি নির্ধারণ করে দিলেও বেসরকারি খাত সেটি মানছে না। বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশিতে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। হ্যাঁ এটি সত্য, আবার এটিও মানতে হবে বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে খুব বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করতে পারছে না। বিইআরসি না থাকলে তারা আরো বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করত। বিইআরসি এ বিষয়ে বেসরকারি খাতকে সতর্ক করছে বারবার। বিষয়টি হলো, জনগণ জানতে পারছে এলপিজি সিলিন্ডারের প্রকৃত দাম কোনটি আর কত দামে তারা কিনছে। বিইআরসির মাধ্যমে দাম নির্ধারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তারা জনগণকে তাদের আয়, ব্যয় ও মুনাফা অর্জন সম্পর্কে জানাতে বাধ্য হচ্ছে। এটিও কম বড় পাওয়া নয়। একই কথা বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলে স্বেচ্ছাচারিতা আরো বেড়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।

আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে ৯০ দিন সময় লেগে যাওয়া ও সরকারের ভর্তুকির বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। এ দুটি কাজই বিইআরসির মাধ্যমে করা সম্ভব। ৯০ দিনের বিষয়টি আইনে বলা নেই। এটা বিইআরসির প্রবিধানমালায় বলা হয়েছে। চাইলেই এটা সংশোধন করে সময় কমিয়ে আনা যায়। এরই মধ্যে সরকার সময়সীমা কমিয়ে ৬০ দিন করেছে। এটি সর্বোচ্চ সময়, বিইআরসি ও সরকার চাইলে এটি এক মাসেই করা সম্ভব। এখানে আইনের কোনো জটিলতা নেই। দরকার সরকারের সদিচ্ছা। মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বিইআরসির প্রক্রিয়া এক মাসের মধ্যেও শেষ করা যায়। এমনকি স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয়ও করা সম্ভব। তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) মূল্য প্রতি মাসেই সমন্বয় করছে বিইআরসি। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ক্ষেত্রেও সেটি সম্ভব। আর ভর্তুকির সঙ্গে দাম নির্ধারণের কোনো সম্পর্ক নেই। ফলে সরকারের আইন সংশোধনের পক্ষের যুক্তিগুলো মোটেই জোরালো নয়। আগে বছরের একবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব জমা দেয়া যেত, এখন একাধিক দফায় বাড়ানো যাচ্ছে, বিধিমালা সংশোধন করা হয়েছে। ঠিক একইভাবে বিইআরসির মাধ্যমে দাম নির্ধারণে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বিশ্বের প্রতিটি দেশেই জ্বালানি পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক স্বচ্ছতার সঙ্গে নির্ধারিত হয়।

পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৬৬ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব এলেও বিইআরসি ২০ শতাংশ বাড়িয়েছে। গ্যাসের দাম ১১৭ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব এলেও বিইআরসি বাড়িয়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ। এছাড়া দাম বাড়ানোর সময় বিভিন্ন শর্ত জুড়ে দেয় বিইআরসি। সংস্থাগুলোকে সাশ্রয়ী ও দক্ষ হওয়ার পরামর্শ দেয়। কারিগরি ক্ষতি (সিস্টেম লস) কমিয়ে রাজস্ব ঘাটতি পূরণের নির্দেশনা দেয়। এ খাতে বিইআরসির যে নজরদারির ক্ষমতা, আইন সংশোধনের পর তা আর থাকবে না। এগুলো কি বিবেচনায় নেয়া হয়েছে?

 

ড. ম তামিম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ; বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী