বাংলাদেশ পড়েছে উভয় সংকটে। একদিকে ডলার সংকট, অন্যদিকে এ সংকট ঘিরে কাঁচামালস্বল্পতায় শিল্পোৎপাদনে বিঘ্ন ঘটছে। এর মধ্যেই গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণপত্র খোলা নিয়ে এলপিজি অপারেটররা বিপাকে রয়েছেন। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসছে। আমদানিও হয়ে পড়েছে ব্যয়বহুল। তাই সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, আবাসিক খাতে আর পাইপলাইনে গ্যাসের নতুন সংযোগ দেয়া হবে না। এক দশকের বেশি সময় আবাসিকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ। এ সময়ে মানুষের আয় বেড়েছে, জীবনযাত্রায়ও এসেছে পরিবর্তন। তাতে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। জ্বালানিনিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশে এখন সম্ভাবনাময় খাত এলপি গ্যাস। গ্রামাঞ্চলেও আয় বৃদ্ধির ফলে অনেক পরিবার এখন খড়ি-লাকড়ির চুলার পরিবর্তে গ্যাসের চুলায় রান্না করছে, জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে সিলিন্ডারের গ্যাস। শিল্প-কারখানা, হোটেল-রেস্তোরাঁয় এলপিজি ব্যবহূত হচ্ছে। কোনো কারণে এর সরবরাহ বিঘ্নিত হলে আবাসিক খাতে জ্বালানি সংকট আরো বেড়ে উঠবে।
উন্নত বিশ্বের মতো যানবাহনের জ্বালানি হিসেবে এলপিজি ব্যবহারের জন্য অটোগ্যাস সার্ভিস স্টেশন ও রূপান্তর কারখানা স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। বাসায় রান্নার কাজে প্রতি বছর গ্রাহক বাড়ছে। শিল্পেও অনেকে এলপিজি ব্যবহার করছেন। এছাড়া প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট থাকায় জ্বালানির জন্য এলপিজির চাহিদা বাড়তেই থাকবে। ২০৪১ সাল নাগাদ দেশে এলপিজির চাহিদা কত হতে পারে, তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেড। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে বর্তমানে ৭০ শতাংশ পরিবার রান্নার কাজে লাকড়ি, শুকনা গোবর ও বায়োমাস ব্যবহার করে। বাকিরা প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলপিজি ব্যবহার করে। প্রতিবেদন বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে ১১ লাখ টনের মতো এলপিজি ব্যবহূত হয়েছে। এক দশকে দেশে প্রতি বছর এলপিজির ব্যবহার বেড়েছে গড়ে ৩৫ শতাংশ করে। এটি অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সালে চাহিদা হওয়ার কথা প্রায় ৭৮ লাখ টন। তবে সব মিলিয়ে এলপিজির চাহিদা দাঁড়াতে পারে ৭০ লাখ টন। বর্তমানে বার্ষিক চাহিদা ১৪ লাখ টন এবং মাসে আমদানি হয় ১ লাখ ২০ হাজার টন। এক্ষেত্রে ঋণপত্র খুলতে না পারায় দুই দিকেই ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। একদিকে এলপিজির সংকটের শঙ্কা, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের ঋণ পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়বে। পণ্য আমদানির জটিলতায় স্থানীয় বাজারে ব্যবসায়ীর লোকসান বাড়লে তাতে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ঝুঁকি তৈরি হবে।
আমদানি কমাতে শতভাগ এলসি মার্জিন নির্ধারণের পাশাপাশি এলসি খোলার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনাপত্তি নিতে হচ্ছে। সব ঠিক থাকার পরও কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক বলে দিচ্ছে, এ এলসি খোলা যাবে না। বিশেষ করে গাড়ি, টিভি, ফ্রিজ, ফুল, ফলের মতো পণ্য আমদানিতে অনেক ক্ষেত্রে অনাপত্তি দিচ্ছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেননা এ ধরনের পণ্যের এলসি খোলার খুব কম দিনের মধ্যে পণ্য এসে যায়। দায় পরিশোধও করতে হয় দ্রুততম সময়ে। এসব পণ্যের বাইরে অন্য যেকোনো ক্ষেত্রে ডলার সংস্থান না করে এলসি না খোলার বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে। ফলে এখন রফতানি আয়ের বিপরীতে ব্যাক টু ব্যাকের বাইরে এলসি হচ্ছে খুব কম। অধিকাংশ ব্যাংক এখন এলসি খোলার আগে আমদানিকারককে ডলার সংগ্রহ করার শর্ত দিচ্ছে। আর আগের দায় পরিশোধে দফায় দফায় সময় নিচ্ছে। আমদানি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে নতুন এলসি কমছে। যদিও বাকি বা দেরিতে পরিশোধের শর্তে আগে খোলা এলসির দায় পরিশোধ বেড়েছে। যে কারণে বৈদেশিক মুদ্রার খরচ কমেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, খাদ্যসহ নিত্যপণ্য আমদানিতে ঋণপত্র খুলতে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই, কিন্তু অধিকাংশ ব্যাংক ডলার সংকটের কথা বলে ঋণপত্র খুলছে না। সরকারের ঘোষণা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা এক্ষেত্রে কাজ করছে না। এক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে পণ্যভিত্তিক ঋণপত্র খোলার বিষয়ে যথাযথ নির্দেশনা দিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলো সেটি মানছে না, তা তদারকি এবং ব্যবসায়ীদের এ-সংক্রান্ত অভিযোগ পেলে দ্রুত তার বিহিত করা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এক সম্মেলনে বলেছিলেন, জানুয়ারি থেকে ডলার সংকট থাকবে না, কিন্তু জানুয়ারির ১৫ তারিখে এসেও ব্যাংকে ডলার সংকট বিরাজ করছে। এখান থেকে পরিত্রাণে রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
বিশ্ব এখন অর্থনৈতিক মন্দায় আক্রান্ত। তা কেমন গভীর ও দীর্ঘ হবে, এটি এখন বড় প্রশ্ন। সংকটের প্রকৃতি দেখতে হবে। আইএমএফসহ সবার ধারণা, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা কাটছে না। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কখন-কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, তা বলা কঠিন হয়ে পড়েছে। আবার ট্রাম্প আমলে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে উত্তেজনার শুরু, তাও বেড়ে গেছে। সব মিলিয়ে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এখন অনেক বেশি। বিশ্বে রাজনৈতিক বৈরিতা আগেও ছিল, কিন্তু এখন তার মাত্রা বেশি। পরিবহন খরচ ও জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমে এলেও সুদহার ও ডলারের দাম যদি স্বাভাবিক পর্যায়ে না আসে, তাহলে অস্থিরতা কমবে না। এমন পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশকে ডলারের জোগান বাড়াতে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এর জন্য রফতানি বৃদ্ধি ও আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসা নিশ্চিত করা জরুরি।
আবাসিক খাতে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এলপিজির আমদানি নির্বিঘ্ন রাখা প্রয়োজন। কারণ ব্যয়বহুলতা ও ডলার সংকটের কারণে এলএনজি আমদানি করছে না সরকার, সরবরাহ সংকটও রয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির কাঁচামালের সংকট নেই। দাম আগের চেয়ে কমেছে, কিন্তু ঋণপত্র জটিলতার কারণে পণ্য আমদানি করা যাচ্ছে না। এতে ব্যবসায় ব্যয় বাড়ছে, যার বোঝা চাপবে ভোক্তার ওপর। বছরের শুরুতেই এলপিজির সিলিন্ডার গ্যাসের দাম কমার মধ্য দিয়ে সুখবর মিলেছিল। ঋণপত্র জটিলতার কারণে সেটি হারিয়ে যাক, তা কারো কাম্য নয়। এক্ষেত্রে তাই ঋণপত্র খোলা নিয়ে জটিলতা নিরসন ও এলপিজি আমদানিতে পর্যাপ্ত ডলারের জোগান নিশ্চিত করতে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেবে বলে প্রত্যাশা।










