নানামুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ। জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা প্রকট হচ্ছে। বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। ক্রমেই কমছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। এ অবস্থায় ব্যয় সংকোচনে নতুন আট সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিরাজমান অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতিতে এটা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী উদ্যোগ। গৃহীত সিদ্ধান্তের এখন কার্যকর বাস্তবায়নই কাম্য।
করোনা মহামারীর অভিঘাত এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বর্তমানে মন্দা ভাব দৃশ্যমান। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের ওপরও এর প্রভাব বেশ ভালোভাবে পড়েছে। কয়েক মাস ধরেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম চড়া। উচ্চমূল্যের কারণে বিশ্ববাজার থেকে জ্বালানি আমদানি অনেকটা দুরূহ হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাহত হয়েছে জ্বালানি সরবরাহ। জ্বালানি সংকট তো আছেই, সরকারের আয়ও কমে গিয়েছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় কম হওয়ায় ডলার সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে বেড়েছে সরকারি ব্যয়। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। আবার মূল্যস্ফীতিও এখন নয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে। সব মিলিয়ে সার্বিক অর্থনীতি নিয়ে বড় উদ্বেগের মধ্যে পড়েছে সরকার। এমন প্রেক্ষাপটে এরই মধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে এনেছে সরকার। রাত ৮টায় দোকান বন্ধ, আলোকসজ্জায় নিষেধাজ্ঞা, সপ্তাহে একদিনের জন্য পেট্রল পাম্প বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সারা দেশে লোডশেডিংয়ের সময়সূচি করে দেয়ার মতো কঠোর নীতিও চালু করা হয়েছে। সতর্কতামূলক এসব পদক্ষেপের সঙ্গে যোগ হয়েছে সম্প্রতি গৃহীত আট দফা সিদ্ধান্ত। এগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ।
চলমান জ্বালানি সংকট এখন একটা বৈশ্বিক বাস্তবতা। এ সংকট মোকাবেলায় প্রতিটি দেশই নিজস্ব কিছু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিছু দেশে মহাসড়কে এরই মধ্যে সাময়িকভাবে গতিসীমা অন্তত ১০ কিলোমিটার কমানো হয়েছে। উদ্দেশ্য, সড়কে যেন যানজট এবং জ্বালানির ব্যবহার কমে আসে। কিছু দেশ যেখানে সম্ভব সেখানে সপ্তাহে তিনদিনের জন্য ওয়ার্ক ফ্রম হোমের ব্যবস্থা করেছে। কিছু দেশ ১৯৭৩ সালের তেল সংকটের সময় সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও পশ্চিম জার্মানির মতো শহরে কার-ফ্রি সানডে নতুন করে প্রবর্তন করেছে। আবার কিছু দেশ নতুন করে গণপরিবহনের উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। মানুষকে হাঁটা ও সাইকেল চালানোয় উদ্বুদ্ধ করছে। জ্বালানির ব্যবহার নানাভাবে কমানোর চেষ্টা করছে। বৈশ্বিক এসব অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তৈরি হচ্ছে অনেক দেশে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আগে থেকেই এ পূর্ব প্রস্তুতিটা নিয়ে রাখা হচ্ছে, যেন ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সমস্যায় পড়তে না হয়। তারই অংশ হিসেবে এ নতুন আটটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সেগুলো হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে আনতে সব মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় কর্মপন্থা নিরূপণ করবে। সরকারি সব দপ্তরে বিদ্যুতের ব্যবহার ২৫ শতাংশ কমাতে হবে। জ্বালানি খাতের বাজেট বরাদ্দের ২০ শতাংশ কম ব্যবহারের লক্ষ্যে অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় পরিপত্র জারি করবে। অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী যারা তেল ব্যবহার করেন, এখন তাদের বরাদ্দ ২০ শতাংশ কম হবে। অনিবার্য না হলে শারীরিক উপস্থিতিতে সভা পরিহার এবং অধিকাংশ সভা অনলাইনে আয়োজন করতে হবে। অত্যাবশ্যক না হলে বিদেশ ভ্রমণ যথাসম্ভব পরিহার করতে হবে। খাদ্যদ্রব্য নিত্যপণ্যের মূল্য সহনীয় রাখতে বাজার মনিটরিং, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মজুদদারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণসহ অন্যান্য পদক্ষেপ জোরদার করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী পরিবহনে ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার যৌক্তিকীকরণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বাড়াতে অর্থবছরের শুরু থেকেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এনবিআরকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বোপরি প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে নিজস্ব ক্রয় পরিকল্পনা পুনঃপর্যালোচনা করে রাজস্ব ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ। এগুলো বাস্তবায়নে সরকারি দপ্তরগুলোকে সচেষ্ট হতে হবে। আমরা দেখছি, এখানে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক পরিপত্র জারির একটা বিষয় রয়েছে। সেটা এখনো করা হয়নি। কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি।
ভালো অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ার একটা প্রবণতা দেশে বিরাজমান। যেমন, পরিপত্র জারি করে নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া সরকারি চাকুরেদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু সেটি থামানো যায়নি। আমরা দেখছি, দেশের অর্থ খরচ করে এখনো অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফরে যাচ্ছেন একশ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা। কখনো প্রশিক্ষণ, কখনো কর্মশালা, আবার কখনোবা যন্ত্র ও কলাকৌশল দর্শন ইত্যাদি অজুহাতে সরকারি টাকায় বিদেশে যাচ্ছেন তারা। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যাপক অপচয় হচ্ছে। একইভাবে ঊর্ধ্বমুখী নিত্যপণ্যের বাজার, বিশেষ করে ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা রোধে নিয়মিত তদারকি এবং টিসিবি কার্যক্রম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। অভিযান চালিয়ে কিছুদিন তদারকি চললেও তা অনিয়মিত হয়ে পড়ে। টিসিবির আওতাও বাড়েনি তেমন। ফলে বাজারে এর খুব একটা প্রভাব পড়েনি। মেলেনি কাঙ্ক্ষিত সুফল। কাজেই শুধু সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না, সেগুলো ঠিকমতো বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা নিয়মিত নজরদারিও করতে হবে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যৌথভাবে একটি পরিদর্শন টিম করা যেতে পারে, যাদের কাজ হবে সরকারি অফিসগুলোয় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা তত্ত্বাবধান করা। মানুষকে কোনো কিছু প্রতিপালন করার আগে সরকার, সরকারি অফিস ও সরকারি সংস্থায় যে কৃচ্ছ্রসাধন নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে, সেটি নিঃসন্দেহে অভিনব। যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে এটা মানুষের কাছে একটা দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপিত হবে। এতে জনগণের আস্থা বাড়বে। সুতরাং বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের আরো দায়িত্বশীল হওয়া দরকার।
বেড়ে চলা মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মানুষ বেশ কয়েক মাস ধরে ভুগছে। অফিসের কাজের সময় কমিয়ে, পেট্রল পাম্পগুলো একদিন করে বন্ধ রেখে এবং দৈনিক ১ ঘণ্টা করে লোডশেডিংয়ের বিষয়ে কঠোরতা কিংবা সাম্প্রতিক নেয়া আট সিদ্ধান্ত সবই বোধগম্য। কিন্তু সরকারকে অবশ্যই জ্বালানি সংকটের পরবর্তী ধাক্কা থেকে জনসাধারণকে রক্ষায় নিজের দায়িত্ব পালনে আরো মনোযোগী ও দক্ষ হতে হবে। একই সঙ্গে সংকট উত্তরণে দূরদর্শী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেককে তার নিজ নিজ জায়গায় থেকে যতটুকু সম্ভব কৃচ্ছ্র সাধন করা, নিজস্ব সঞ্চয় বাড়ানো, মিতব্যয়ী হওয়া, সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় পরিহার এবং অপচয় কমানোর পরামর্শ দিচ্ছেন বারবার। তার পরামর্শ আমলে নিয়ে আমাদেরও বাড়তি সচেষ্টতা প্রয়োজন।










