বিদেশের বুকে বাঙালি আর দেশের বুকে রেমিট্যান্স একটি কয়েনের এপিঠ-ওপিঠের মতো। কারণ নিজেদের সার্বিক ভাগ্যোন্নয়নে প্রতি বছর হাজারো তরুণ পরিবার-পরিজন ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। বিদেশের শত প্রতিকূলতা ও বৈরী পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে। প্রবাসে কর্মরত এসব শ্রমজীবী মানুষের ঘামের ফলে পাওয়া অর্থই রেমিট্যান্স, যা দেশের অর্থনীতিকে করছে আরো গতিশীল। প্রায়ই শোনা যায় একদল জ্ঞানহীন তাদের কামলা বলে সম্বোধন করছে। তবে তারা কামলা নয়, বরং তারা এক-একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা। দেশের অর্থনীতিতে অক্সিজেনের মতো ভূমিকা রাখে তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স । তবে এ রেমিট্যান্স উপার্জনের পেছনে প্রত্যেক প্রবাসীর রয়েছে আলাদা রকমের গল্প। সে রকমই এক রেমিট্যান্স যোদ্ধার গল্প এবার শুনাব। শৈশব থেকেই সে বড্ড দুরন্ত ও চঞ্চল স্বভাবের। তীক্ষ মেধা আর বুদ্ধিমত্তা যেন তার চেহারার ভাঁজে ছিল। গলায় আছে তার তুখোড় সুর। সেই ছোট্ট ছেলেটার নাম আব্দুর রহিম। চার ভাই-বোনের মধ্যে সে বাবা-মায়ের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। তার বাড়ি মাগুরা জেলার ওমেদপুর গ্রামে। পরিবার চাইত অন্য তিন ভাই-বোনের মতো সেও পরীক্ষায় ভালো ফল করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক। যেমনটা আর পাঁচ-দশটা পরিবার চাই আর কী। প্রাথমিক লেভেল পর্যন্ত ক্লাসে তার পজিশন সবার আগে থাকত। দিন যতই যেতে লাগে তার অবনতি হতে শুরু করে। এর মধ্যে দুয়েকটা স্কুল, মাদ্রাসা পরিবর্তন করে ফেলে। ধীরে ধীরে তার পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ কমে যায়। পড়ালেখার আগ্রহ কমে গেলেও খেলাধুলা তার নেশা ছিল। সঠিক তদারকি পেলে হয়তো সেই নেশাটা একদিন পেশা হয়ে যেতে পারত। উল্লেখ্য, একজন ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে তাকে দেশের মধ্যে আট বা সাড়ে আট দেয়া যেতেই পারে। কারণ এলাকায় আয়োজিত ফুটবল টুর্নামেন্ট থেকে প্রায় ৫০টি প্লেটসহ বিভিন্ন আসবাব, টিভি এগুলো তিনি জিতেছেন। পরপর কয়েকবার তিনি ফুটবল টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। এক কথায় গ্রামের আয়োজিত টুর্নামেন্টে সে হতেন মাঠের রাজা, খেলার রাজা এবং খেলোয়াড়দের রাজা। ফুটবল খেলার পাশাপাশি চাচা আপন প্রাণ বাঁচা খেলায় তিনি পরপর কয়েকবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। তার বন্ধু কখনো এ খেলায় চ্যম্পিয়ন হতে পারেনি, সে কথা শুনে রহিম নিজের বেলুন ফাটিয়ে বন্ধুকে চ্যাম্পিয়ন হতে সাহায্য করেছেন। এমন উদার মন সত্যিই বিরল! অভাবের টানাপড়েন আর সমাজের গত্বাঁধা রীতির মাঝে নিঃশেষ হয়ে গেল মনের কোণে লুকানো সুপ্ত স্বপ্ন, একজন ফুটবল খেলোয়াড়ের। এরপর জীবন-জীবিকার তাগিদে তাকে বেছে নিতে হলো প্রবাস জীবন। গত ১০ জুন সব প্রস্তুতি শেষ করে তার বড় ভাইয়ের সহায়তায় দুবাইয়ে পাড়ি জমান রহিম। লক্ষ্য তার উপার্জন করে সংসারের হাল ধরা। সেখানে যাওয়ার পর হলো আরেক সমস্যা। মাসখানেক কাজবিহীন এক বোঝা জীবন পার করার পর অবশেষে কাজ পেলেন তিনি। এখন রহিম দুবাইয়ের একটি কোম্পানির শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত আছেন। রহিম আশা করছেন, সব রকম পারিবারিক ঋণসহ লেনদেন মিটিয়ে বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করবেন। এভাবেই শেষ হয়ে যায় রহিমের মতো প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড়। অভাব মানুষকে কখনোই দমিয়ে রাখতে পারে না, যদি কারোর চেষ্টা থাকে। তবে পরিবারের উচিত সন্তান কী হতে চায় তা বুঝে, তাদের সেভাবে গাইড করা। যেমনভাবে শুরু হয়েছে রহিমের প্রবাস যাত্রা, ঠিক সেভাবেই ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্ন গল্পে শুরু হয় প্রবাসীদের যাত্রা। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে অর্জিত আয় নিজেদের পরিবারের থেকে শুরু করে মূলত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিউক্লিয়াস হিসেবে কাজ করে। তাদের আয়ের থেকে প্রাপ্ত রেমিট্যান্স আমাদের মোট অভ্যন্তরীণ আয় বা জিডিপির ৩০-৩৫ ভাগ। দেশকে উন্নত দেশে উত্তরণের অভিযাত্রায় এগিয়ে রাখতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন রেমিট্যান্স প্রেরক প্রবাসী বাংলাদেশীরা। তাই তো তারা পুরো পৃথিবীর কাছে রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে খ্যাত।
শরিফুল ইসলাম: শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ










