আমেরিকান রাজনৈতিক লেক্সিকনে একটি নতুন শব্দ যুক্ত হয়েছে, বাইডেনোমিকস। গত বছর নভেম্বরে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নামানুসারে, তার প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনার এ নামকরণ। স্বাভাবিকভাবেই এ নামকরণের তুলনা চলে আসে আরেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনুসৃত অর্থনৈতিক নীতিমালার সঙ্গে। তিনি রোনাল্ড রিগ্যান, তার অনুসৃত অর্থনীতির নাম দেয়া হয়েছিল রিগ্যানোমিকস।
আমেরিকার রক্ষণশীল রাজনীতিকদের কাছে এই রিগ্যানোমিকস অনেকটা ‘অতি পবিত্র গাভী’র মতো, একে ছোঁয়া যাবে না। রিগ্যানের নাম নিতে গিয়ে এসব রাজনীতিকের অনেকের চোখ সজল হয়ে আসে। আহা, বড় ভালো ছিল সময়টা। অর্থনীতি বাড়বাড়ন্ত, শেয়ারবাজারের ফাটাফাটি অবস্থা, করপোরেশনগুলোর মুনাফা রেকর্ড পরিমাণ। এমনকি গরিব-গুর্বোরা পর্যন্ত কেমন গায়েপায়ে চর্বি লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল।
আমরা আশির দশকের কথা বলছি। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত মোট আট বছর রিগ্যান আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এ সময়ে তার অনুসৃত অর্থনৈতিক নীতিমালার মোদ্দা কথা ছিল: ধনীদের, বিশেষ করে বৃহৎ করপোরেশনের ওপর করের বোঝা কমাও, ব্যবসা করার নিয়মকানুন শিথিল করো, সরকারের ভূমিকা যতদূর সম্ভব ছেঁটে ফেল। সম্পদ বাড়ানোর ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি যারা সম্পদশালী, তারা যত সম্পদশালী হবে, দেশের মোট সম্পদও তত বাড়বে। এই রিগ্যানোমিকসের অন্য নাম ছিল ‘ট্রিকল ডাউন ইকোনমিকস’ বা ‘চুইয়ে পড়া অর্থনীতি’। বোতলে তেল ঢালতে থাকলে একসময় যেমন সে তেল উপচে উঠে চুইয়ে পড়ে, অর্থনীতিও সে রকম। বোতলের নিচে যারা রয়েছে, অর্থাৎ গরিব-গুর্বোরা, তারা আনন্দের সঙ্গে সে চুইয়ে পড়া তেল গায়ে মেখে হাওয়া লাগাবে।
রিগ্যানোমিকসের অনেক আগেই গত হয়েছিলেন বিখ্যাত উদারনৈতিক অর্থনীতিবিদ জন কেনেথ গ্যালব্রেথ। তার কথায়, ঘোড়াকে যদি ভুট্টা বা ঘাস খাওয়াতেই থাক তাহলে একসময় তার পশ্চাদ্দেশ দিয়ে সে ঘাস-ভুট্টা বেরোবে। পথের দুধারের চড়ুই পাখিদের তা নিয়েই খুশি থাকতে হবে। ঘোড়ার জায়গায় ধনিক শ্রেণী ও পাখির জায়গায় গরিব মানুষ বসিয়ে নিন, রিগ্যানোমিকসের মাজমা পরিষ্কার হবে।
এ কথায় কোনো তর্ক নেই যে রিগ্যান আমলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সব সুফল ভোগ করেছিল শুধু দেশের অতি-ধনীরা, যাদের আমরা ‘ওয়ান পার্সেন্টার’ নামে জানি। মোট সম্পদ বেড়েছে তা ঠিক, কিন্তু ধনী-দরিদ্রের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়ে পাহাড়সমান হয়ে দাঁড়ায়। গত চল্লিশ বছর যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রশাসনই কম বেশি রিগ্যানের এ চুইয়ে পড়া অর্থনীতি অনুসরণ করেছে, তার ফল দাঁড়িয়েছে এই যে যুক্তরাষ্ট্রে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য পশ্চিমা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। এই ১ শতাংশের হাতে এখন আমেরিকার মোট সম্পদের ৩০ শতাংশ বন্দি। এমনকি এই কভিডের মধ্যেও তাদের ভুট্টা ও ঘাস খাওয়া বন্ধ হয়নি। হিসাব করে দেখা গেছে, আমেরিকার তিনজন সেরা ধনী জেফ বেজোস, বিল গেটস ও ওয়ারেন বাফেটের হাতে এখন এ পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, যা দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ১৬০ মিলিয়ন মানুষের মোট সম্পদের চেয়েও বেশি।
এ চুইয়ে পড়া ব্যবস্থা চলতে পারে না, পারা উচিত নয়। সে কথাই বলেছেন জো বাইডেন। কোনো রাখঢাক ছাড়াই তিনি বলেছেন, চুইয়ে পড়া অর্থনীতি আগে কাজ করেনি, এখনো করছে না। গত বছর নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি প্রথম এ কথা বলেন। গত মাসে কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে তিনি ফের সে কথা বললেন। অতি-ধনীদের আরো অধিক কর রেয়াতির বদলে তাদের ওপর অতিরিক্ত কর ধার্য করতে হবে, এমন ‘অদ্ভুত’ কথা বলার পর তিনি বলেন, এখন সময় এসেছে অর্থনীতিকে তৃণমূল ও মধ্য পর্যায় থেকে টেনে ওপরে তুলে আনার। ‘আমি ধনীদের শাস্তি দিতে চাই এমন নয়, কিন্তু দেশের এক পারসেন্ট অতি-ধনীর আয়করের ন্যায্য হিস্যা হতে হবে।’
রিগ্যানোমিকসের ক্ষতিকর প্রভাব বদলাতে হলে শুধু ধনীদের ওপর অতিরিক্ত করারোপ করলেই চলবে না। এর জন্য যা জরুরি তা হলো সম্পদের অধিক ভারসাম্যপূর্ণ পুনর্বণ্টন এবং দরিদ্র ও কম অধিকারভোগীদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও চাকরির ক্ষেত্রে অধিক সুবিধার সৃষ্টি। জো বাইডেন এরই মধ্যে যে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন, তা ঠিক এ উদ্দেশ্য নিয়ে এগোচ্ছে। বিষয়টি ভেঙে দেখা যাক।
কংগ্রেসের ভেতরে ও বাইরে রিপাবলিকানদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও জো বাইডেন এরই মধ্যে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের একটি প্রণোদনা কর্মসূচি অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন। কভিডের কারণে অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা এড়াতে এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন আরো দুটি প্রণোদনা প্যাকেজ গ্রহণ করে, যার অধিকাংশ সুবিধা ঘরে তুলে নিয়েছে সেই পুরনো ধনিক শ্রেণী। যে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের কর অব্যাহতি আইন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলে গৃহীত হয়, তার ৮০ শতাংশই গেছে এমন মানুষদের পেটে ও পকেটে যাদের ব্যক্তিগত আয় ১ মিলিয়ন ডলারের বেশি। এ হিসাব দিয়েছে নিরপেক্ষ জয়েন্ট কমিশন অন ট্যাক্সেশন। পক্ষান্তরে বাইডেন যে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের ‘অর্থনৈতিক ত্রাণ’ কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন, অর্থনীতিবিদরা বলছেন তার ৮০ শতাংশ সুবিধাই ভোগ করবে নিম্ন আয়ের মানুষ। এর মাধ্যমে শুধু যে ব্যক্তিপ্রতি ১৪০০ ডলারের নগদ অর্থ তুলে দেয়া হয়েছে তাই নয়। এতে রয়েছে এমন অনেক ব্যবস্থা, যার ফলে এ দেশের প্রায় দেড় কোটি মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত হবে। যে অতিরিক্ত ত্রাণ পাওয়া যাবে তাতে এ দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবার গড়ে ৫০ হাজার ডলার অতিরিক্ত আয়ের মুখ দেখবে। ক্ষুধামুক্ত হবে দেশের ক্ষুধার্ত শিশুদের ৫০ শতাংশ।
প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের আমলে যে ‘নিউ ডিল’ কর্মসূচি গৃহীত হয়, তারপর এই প্রথম ব্যবসায়ী ও ধনিক শ্রেণীর বদলে ক্ষুদ্র মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। বাইডেনের স্টিমুলাসের আদ্যোপান্ত পর্যালোচনা শেষে ওয়াশিংটনভিত্তিক আরবান ইনস্টিটিউট মন্তব্য করেছে, এটি হলো ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধ ঘোষণা।
দারিদ্র্য ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাইডেন আরো দুটি প্রস্তাব সামনে এনেছেন—অবকাঠামো প্রকল্প ও পরিবার সংরক্ষণ প্রকল্প। এ দুই প্রকল্পে বাইডেন মোট ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব করেছেন। ফলে একদিকে আমেরিকার ভগ্নপ্রায় অবকাঠামো—তার সেতু, সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা—নতুন করে গড়ে তোলা হবে। অন্যদিকে কম সুবিধাভোগী মানুষের কল্যাণে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। এতে থাকবে শিশু পরিচর্যার জন্য মাসিক অনুদান, বেতনসহ পারিবারিক ছুটির সুযোগ, সব শিশুর জন্য প্রাক-বিদ্যালয়, গ্রামীণ এলাকায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইন্টারনেট, বিনা খরচে দুই বছর কলেজে পড়ার সুযোগ। এককথায়, আমেরিকাকে একুশ শতকের জন্য প্রস্তুত হওয়ার পরিকল্পিত উদ্যোগ।
রিগ্যানোমিকসের সঙ্গে এ বাইডেনোমিকসের দুটো স্পষ্ট তফাত রয়েছে। রিগ্যানের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ‘টার্গেট’ ছিল ধনিক শ্রেণী, বাইডেনের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত। রিগ্যান সরকারের ভূমিকাকে যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার পক্ষে, অন্যদিকে বাইডেন চান সে ভূমিকা যতটা সম্ভব সম্প্রসারিত করতে। রিগ্যানের বিখ্যাত উক্তি ছিল, সরকারের হাত যত বাড়ে ব্যক্তি অধিকার তত সংকুচিত হয়ে আসে। সরকারের ভূমিকা সংকুচিত করার কথা বললেও তিনি অতি-ধনীর স্বার্থ রক্ষায় সম্ভাব্য সব উপায়েই তাকে ব্যবহার করেছেন। অন্যদিকে বাইডেন চাইছেন সরকার যাতে সবার উপকারে আসে তা নিশ্চিত করতে। তিনি চান সরকারকে ব্যবহার করেই আমেরিকার অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিত্জ বলেছেন, সরকারি হস্তক্ষেপের কারণেই রিগ্যান আমলে ধনীরা আরো ধনী হতে পেরেছে। বাইডেন সেই সরকার ব্যবহার করতে চাইছেন লাগামছাড়া মুনাফাবাজি, বাজার ব্যবস্থার খেয়ালখুশি ও মধ্যবিত্তের ক্রমপতন ঠেকাতে। ‘অনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি থেকে অধিকাংশ আমেরিকান কখনই সুফল পায়নি।’
বাইডেনোমিকস বলুন বা অন্য নাম দিন, মোদ্দা কথা হলো মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত জো বাইডেনের হাত ধরেই পরিবর্তনের এক অভাবিত সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। রুজভেল্ট ইনস্টিটিউটের ফেলিসিয়া ওয়াং এ সুযোগকে বলেছেন ‘এক অসাধারণ মুহূর্ত’। বাইডেন সফল হলে এতদিন আমেরিকার অর্থনীতি যে পথে এগিয়েছে, তা হয়তো পুরোপুরি বদলে যাবে।
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক










