কভিড-১৯ মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক কয়েকটি কারণে ২০২৩ সালটি সংকটের বছর হওয়ার আশঙ্কা করছে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা। তাই সবাইকে প্রস্তুত থাকতে ও খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানোসহ ছয় দফা পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা। এগুলো হলো খাদ্য উৎপাদন জোরদার, পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ গড়ে তোলা, বিদেশে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণ,  রেমিট্যান্স প্রেরণ বৃদ্ধি, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ ও করহার যৌক্তিকীকরণ। নির্দেশনাগুলো যথার্থ এবং তা নিয়ে কারো সংশয় নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো বাস্তবায়ন নিয়ে। এর আগে সরকার কৃচ্ছ্র সাধনে কিছু নির্দেশনা দিয়েছিল, সেগুলো যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কঠিন সময় পার করলেও মন্দাসহ নানা সংকটে অর্থনীতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা নেই। কারণ বিগত দুই দশকেরও অধিক সময়ব্যাপী অর্থনীতির ক্রমবর্ধিত অগ্রগতি দেশকে একটি ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে কৃষি ও শিল্পোৎপাদন, সার্ভিস সেক্টরের বিস্তৃতি এবং জনগণের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ফলে খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষাবস্থার সম্ভাবনা কম। অবশ্য অসৎ ব্যবসায়ীদের মজুদদারি, কালোবাজারি ও মুনাফাখোরি আচরণ, আমদানি-রফতানির আড়ালে মুদ্রা পাচার, ব্যাংকের ঋণখেলাপি, দুর্নীতি ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব না হলে অবস্থা অন্য রকম হতে পারে। এ মুহূর্তে আমাদের বড় সমস্যা বা চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিতিশীলতাসহ টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানি বৃদ্ধি ও রফতানি হ্রাসের কারণে বাণিজ্য ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ক্রমহ্রাস এবং জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস। প্রত্যাশা থাকবে, আলোচ্য নির্দেশনা বাস্তবায়নে তদারকি জোরদার করবে সরকার।

আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে একদিকে যেমন অধিক পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে খাদ্যদ্রব্যসহ উৎপাদনের উপকরণ আমদানি করতে হচ্ছে, অন্যদিকে সংঘবদ্ধ ব্যবসায়ীদের বাজার নিয়ন্ত্রণের ফলে দ্রব্যমূল্য বেড়েই চলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তরল গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি আমাদের দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি বয়ে এনেছে। জ্বালানিস্বল্পতার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারায় কলকারখানার উৎপাদন অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। অধিকাংশ ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় বড় শিল্প-কারখানা ৪০-৬০ শতাংশ ক্যাপাসিটিতে চালু রাখা হয়েছে। ফলে উদ্যোক্তারা লোকসান গুনছেন, শ্রমিক কাজ হারাচ্ছেন। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিতিশীলতা, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন কারেন্সি রিজার্ভের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছে। যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে রফতানি বহুগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। এজন্য একদিকে যেমন স্বল্প পরিমাণের রফতানি বিধি শিথিল ও আধুনিক করতে হবে, অন্যদিকে তেমনি প্রবাসী বাংলাদেশীদের রফতানিকাজে নিয়োজিত করতে হবে। একইভাবে আমদানি ব্যয় হ্রাস করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে কার্যকরভাবে। আমদানি ব্যয় যাতে অকারণে বৃদ্ধি না পায় তার ব্যবস্থা নিতে হবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রবাসীরা মানি ট্রান্সফার এজেন্সির মাধ্যমে অর্থ প্রেরণ করে থাকেন, আর এই এজেন্সির মাধ্যমে অর্থ প্রেরণ করলে উল্লেখযোগ্য অংশ হুন্ডির মাধ্যমে স্থানান্তর হয়। ফলে দেশ বঞ্চিত হয় বৈদেশিক মুদ্রা থেকে। আমরা যতই সমালোচনা করি না কেন, নানা কারণে এই হুন্ডি এক বাস্তবতা। এটি বন্ধ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে অধিকসংখ্যক ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোর যথাযথ যোগাযোগ স্থাপন করে ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ প্রেরণ সহজ ও অবারিত করা। এ কথা ঠিক যে বর্তমান কঠোর কমপ্লায়েন্সের কারণে বিশ্বের অনেক বৃহৎ ব্যাংকের সঙ্গে চাইলেই এ যোগাযোগ সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব নয়। এ কারণেই বিভিন্ন ছোট এবং মধ্যম মানের ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। এ কথা অনস্বীকার্য যে আগামী বছর হবে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার সবচেয়ে খারাপ সময়। আর আমাদের দেশে এ মন্দার প্রভাব মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছেন, যেমন দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি, দৈনন্দিন জীবনে সাশ্রয়ী হওয়া এবং রফতানি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া। মূলত এসবই মন্দা মোকাবেলার জন্য এ মুহূর্তে সর্বোত্কৃষ্ট পদক্ষেপ এবং সে কারণেই এ পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে এখন থেকেই। শুধু নির্দেশনা দিলেই হবে না মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে চার দফা, আট দফা ইত্যাদি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, যার অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে সংকট ত্বরান্বিত হয়েছে। এবারে মন্ত্রিসভা নির্দেশনা দিয়েছে এবং এর বাস্তবায়নেও তারা তদারকি জোরদার করবে বলে প্রত্যাশা।

ভুলে গেলে চলবে না, নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির একটি অপরিহার্য অংশ। কিন্তু এই মূল্যস্ফীতি যখন অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় চলে যায় তখন বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে দেয় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে, এদিকে আবার উচ্চসুদের হার তখন দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে থামিয়ে দেয়। ৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছিল ফেডারেল রিজার্ভ, যার হাত ধরে তৈরি হয় মন্দা। আধুনিক অর্থ ব্যবস্থায় অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপে প্রথম মন্দা দেখা দেয়। তবে আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা হয়েছিল ১৯২৯ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত, যাকে মহামন্দা বলে। সংকটের আগে এশিয়ান টাইগার নামে পরিচিত পূর্ব এশীয় দেশ থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক অঞ্চলে ঢুকে পড়েছিল বিপুল বিদেশী অর্থ। বেড়ে গিয়েছিল বিদেশী ঋণ। এর ফলে অর্থনীতিতে তৈরি হয় কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা। একপর্যায়ে বিনিয়োগকারী আস্থা হারিয়ে অর্থ তুলে নিতে থাকলে ধসে পড়ে এ দেশগুলোর অর্থনীতি। পশ্চিমা বিশ্ব ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা দেখেছিল গত শতকের ত্রিশের দশকে, যা ইতিহাসে মহামন্দা নামে পরিচিত। পূর্বের দেশগুলোর মন্দা বা দুর্ভিক্ষের চেয়ে পশ্চিমের এই অর্থনৈতিক মহামন্দার প্রেক্ষাপট হয়তো বেশ ভিন্ন। কিন্তু সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় সংঘটিত হয়েছিল, এর তুলনীয় বিপর্যয় খুব কমই দেখেছে বিশ্ব।

অর্থ পাচার বন্ধ করতে হবে। নির্বাচনের আগে এটি বেড়ে ওঠে বটে, তবে অর্থনৈতিক সংকটে এটি বন্ধ করতে হবে। ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিং রোধে এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে ব্যবস্থা নিতে পারে। বর্তমানে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও অর্থ পাচারের কথা শোনা যাচ্ছে। এ বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। ব্যাংক ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার সংকট থাকায় অনেক ব্যাংক এলসি খোলায় অনীহা প্রকাশ করছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে খাদ্যপণ্য, সার ও জ্বালানি আমদানির এলসি খোলা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মজুদ ও সরবরাহ যাতে বিঘ্নিত না হয় সেদিকে লক্ষ রাখার কথা বলা হচ্ছে। এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন প্রয়োজন। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি গত চার মাসে মাত্র ২ শতাংশ। রেমিট্যান্সের জন্য বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক মালিকদের যৌথভাবে নির্ধারিত বিনিময় হার প্রতি মার্কিন ডলারে ১০৭ টাকা অথচ ডলারের বাজারদর এর চেয়ে বেশি। ফলে ব্যাংকের পরিবর্তে হুন্ডির মাধ্যমে প্রবাসী আয় পাঠানোর পরিমাণ সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রবাসী আয়ের বিনিময় হার বাজারদরের সঙ্গে সংগতি রেখে বাড়ানো প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক সংকট আরো প্রকট হওয়ার আগেই আমাদের কতিপয় বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখার প্রতি নজর দিতে হবে। অভ্যন্তরীণ কৃষি ও শিল্পোৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। মজুদদারি, কালোবাজারি, অতিমুনাফালোভীদের অপতত্পরতা রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ও নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। ব্যাংকের আমানতের সুদের হার অনেক আগেই মূল্যস্ফীতির নিচে চলে গেছে। তাছাড়া ঋণের সুদ কমিয়ে রাখার সুবিধা গ্রহণ করে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। মূল্যস্ফীতির লাগাম টানার জন্য সুদের হার বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। ঋণখেলাপিদের প্রদত্ত সুবিধা প্রত্যাহারপূর্বক খেলাপি ঋণ আদায়ে আরো কঠোর ও তত্পর হতে হবে। দেখা যায় ব্যাংকগুলো অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট ঋণ আদায়ে বেশ তত্পর অথচ চিহ্নিত খেলাপিদের ঋণ আদায়ে তেমন উদ্যোগ নেই। এক্ষেত্রে আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। খেলাপিদের স্বার্থের চেয়ে আমানতকারীসহ অন্যান্য গ্রাহকের স্বার্থের দিকে নজর দিতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অসাধু খেলোয়াড়দের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। দেশের এ ক্রান্তিলগ্নে বৈদেশিক মুদ্রা ধরে রেখে কতিপয় লোকের ব্যবসা করা মোটেই কাম্য নয়। প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বৈধ পথে আনার ব্যাপারে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কার্ব মার্কেটের দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রবাসী আয়ের বিনিময় হার নির্ধারণ হওয়া প্রয়োজন, যাতে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানো হয়। তাছাড়া রেমিট্যান্সের সম্ভাবনাময় যেসব দেশে বাংলাদেশীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের এক্সচেঞ্জ হাউজ নেই, সেসব দেশে ব্যাংকের এক্সচেঞ্জ হাউজ খোলার পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। হুন্ডি ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরো সক্রিয় হতে হবে।