প্রাচ্যের ড্যান্ডিখ্যাত দেশের অন্যতম প্রাচীন শহর নারায়ণগঞ্জ। শীতলক্ষ্যা নদীতীরে গড়ে ওঠা এ শহরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বেশ উপরে থাকায় সেখানকার আবহাওয়া প্রাকৃতিক কারণেই ছিল শীতল। তবে ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ আর শিল্প-কারখানার প্রসার ঘটায় শহরটির তাপমাত্রা বাড়ছে। নারায়ণগঞ্জে বিদ্যমান খালের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শহরটির তাপমাত্রা কমিয়ে আনার সুযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্টদের সে বিষয়ে কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। একটি শহরের তাপমাত্রায় ভারসাম্য আনার জন্য খাল সংরক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একসময় খাল দেশে খুব স্বাভাবিক বিষয় হলেও বর্তমানে তা হারিয়ে যাওয়ার দশা। সবার মনোযোগ বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের দিকে ধাবিত হয়েছে। এতে তাপমাত্রা বেড়ে উঠছে। কিন্তু সভ্যতার ক্রমবিকাশে প্রাকৃতিক জলাধার বা খালের যে ভূমিকা রয়েছে তা অস্বীকার করা যাবে না। ফলে নারায়ণগঞ্জের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অব্যবহূত খালগুলো পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনকেই বড় ভূমিকা রাখতে হবে।
নারায়ণগঞ্জ শহরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে, যেখানে দেখা গিয়েছে ২০১১ সালে শহরটির তাপমাত্রা ছিল ২২ দশমিক ৮৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর ২০১৯ সালে শহরটির তাপমাত্রা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাত্ এ সময়ের মধ্যে শিল্প-কারখানাগুলো বেড়ে যাওয়ায় নারায়ণগঞ্জে অন্তত দশমিক ৫১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। নারায়ণগঞ্জের তাপমাত্রা আরো বেশি বলে নাসিক কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। গবেষণা জরিপ-পরবর্তী সাম্প্রতিক বছরগুলোয় শহরটির শিল্প এলাকায় তাপমাত্রা ৩০-৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থেকেছে, যা উদ্বেগজনক।
রাজধানী ঢাকার খালগুলো সে কবেই দখল হয়ে গেছে, সেগুলো উদ্ধারে কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে বিশ্বের বসবাসের অযোগ্য শহর হিসেবে ঢাকা নাম লিখিয়েছে। এখন ঢাকার পাশের জেলা নারায়ণগঞ্জে যারা এত দিন বসবাস করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলেন, তারাও ক্রমাগত নগরায়ণের প্রসার আর অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার ফলে সৃষ্ট ভোগান্তির সম্মুখীন হচ্ছেন। যেসব খাল শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারত, সেসব খালকে উদ্ধার না করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় উল্টো নারায়ণগঞ্জের তাপমাত্রা আরো বাড়ছে। এটা সত্য, নগরায়ণ বেড়ে যাওয়ায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু খাল ব্যবহার করে যে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেটির দৃষ্টান্ত আমরা ইউরোপের দেশগুলোয় দেখেছি। ইতালির ভেনিসেও কংক্রিটের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় একসময় খালগুলোকে সীমিত করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে তারা আবারো খালগুলোকে পুনরুদ্ধার করে আগের স্থানে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। নারায়ণগঞ্জের ক্ষেত্রেও তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য খাল পুনরুদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই। শহরটিতে অব্যবহূত ২৫ খালকে সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখা হলেও এটি আসলে ব্যবহার না হওয়ায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির এ সমস্যাটি দেখা যাচ্ছে। দ্রুতই সেগুলো পরিষ্কার করে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
নারায়ণগঞ্জ শহরে ছোট-বড় ২৬টি খালের মধ্যে শুধু বাবুরাইল খাল নগরবাসীর জন্য ব্যবহার উপযোগী করা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করা সে খালটিও পুরোপুরিভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালটি এরই মধ্যে কচুরিপানা দিয়ে ভরে গিয়েছে, এমনকি খালের কিছু অংশ দূষণ হচ্ছে। খালটি উদ্ধারের পর সেখানে ঘুরতে যাওয়া দর্শনার্থীরাই খালের ভেতর খাবারের প্যাকেট, বোতল ফেলে এ দূষণ করছেন। অর্থাত্, খাল রক্ষণাবেক্ষণে নাগরিকদেরও সচেতনতা দেখা যাচ্ছে না। এর মধ্যেই নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে আরো পাঁচটি খাল রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলমান। দ্রুতই অবশিষ্ট খাল পুনরুদ্ধারপূর্বক আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে শুধু উদ্ধার করলেই হবে না, সেগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও করতে হবে, যাতে কচুরিপানা বা ময়লায় সেগুলো ভরাট অথবা দখল হয়ে না যায়। নগর উন্নয়নে উঁচু দালানকোঠা আর শিল্পাঞ্চল যেমন জরুরি, ঠিক তেমনিভাবে নগরীতে বসবাসরত মানুষের জন্য শহরকে বসবাস উপযোগী করে রাখাটাও প্রয়োজন। কারণ শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি জীবনযাপনের বিষয়টিও ভাবতে হবে। দেখা যাচ্ছে, এক্ষেত্রে প্রাকৃতিকভাবে তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে খালগুলো পুনরুদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই। এটি সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারাও মনে করছেন। নারায়ণগঞ্জ শহরের যে খালটি উদ্ধার করা হয়েছে সে এলাকায় এবং নগরীর অন্যান্য এলাকায় তাপমাত্রা পরিমাপক যন্ত্র বসিয়ে দেখা গিয়েছে যে খাল উদ্ধার করা এলাকার তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি কম রেকর্ড হয়েছে। এ তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
রাজধানী
ঢাকা থেকে
নিকটবর্তী ও সহজ যোগাযোগ
সুবিধা থাকায়
এ শহরটি
শিল্পের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তাই স্বাভাবিকভাবেই সেখানে শিল্প-কারখানার
সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়ছে। ফলে শহরটির
তাপমাত্রা বেড়ে
যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। অভিজ্ঞতা
বলে সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় তাপমাত্রা কম থাকে। তাপমাত্রা কমানোর ক্ষেত্রে পানি
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করে।
পানি তাপ
শোষণ করে
নেয়ার কারণেই
এটি হয়।
সে হিসেবে
নদীতীরবর্তী এলাকায়
গরম কম অনুভূত হয়, তাপমাত্রাও থাকে
কম। কিন্তু
নারায়ণগঞ্জে খালগুলোকে অব্যবহূত হিসেবে ফেলে
রাখায় সেখানে
কচুরিপানা জন্মেছে।
এর ফলে
উপকারের বদলে
খালগুলোয় জমে
থাকা বদ্ধ
পানিতে মশার
বিস্তারও ঘটছে।
সরকারি মালিকানাধীন হওয়ায় এ খালগুলোর
রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকর করার
দায়িত্বও সিটি
করপোরেশনের। শুধু
মশার বিস্তার
যেন না ঘটে সেজন্য
অব্যবহূত খালে
মশার ওষুধ
দিলেই কাজ
হবে না, শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে খালগুলোকেও কার্যকর
করতে হবে।
ঢাকাতেই যেভাবে খালগুলোকে অকার্যকর দেখতে পাচ্ছি, সেখানে নারায়ণগঞ্জের খালগুলো আশার বিন্দু হতে পারে। কারণ খাল ব্যবহারের মাধ্যমে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের বড় একটা উদাহরণ ছিল নারায়ণগঞ্জ, সেক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জের খালগুলো পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করে তুললে নিঃসন্দেহে নারায়ণগঞ্জ পুরো দেশের কাছে মডেল সিটি হিসেবে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক বিষয় হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের খালগুলো অন্য শহরের তুলনায় বেদখল অবস্থায় নেই, খালগুলো সরকারের অধীনে থাকায় তাই খুব সহজেই পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করে তোলা সম্ভব। এক্ষেত্রে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাস্তব প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে খাল পুনরুদ্ধারে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সদিচ্ছা জরুরি।










