চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি এসেছে এমন সময়ে যখন অর্থনীতির কিছু সমস্যা নিয়ে দুশ্চিন্তা বিরাজ করছে। তবুও এ মাসে বাংলা ভাষার প্রসার, ভাষার গৌরব নিয়ে আলোচনায় একটি গতি আসে। সেটা অবশ্যই শুভ দিক, যদিও এ গতি সারা বছর ধরে রাখতে পারলে আরো কল্যাণকর হতো। এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে বাংলা ভাষার প্রসারের শ্লথগতি বিষয়ে কিছু চিন্তাভাবনার বিষয় তুলে ধরছি, অর্থনীতি ও উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে।

ভাষার উন্নয়ন কেন সামগ্রিক ‘‌উন্নয়ন’-‌এর রূপকল্পতে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ভাষাই আমাদের অস্তিত্ব স্বরূপ; বাংলা ভাষাতেই রয়েছে আমাদের পরিচিতি, আমাদের অনুপ্রেরণা। তাই তো এ ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে জীবন দিয়ে।

বাংলা ভাষার প্রসার ও উন্নয়নের জন্য প্রথমেই স্বীকৃতি দিতে হবে যে এটা শুধু সাময়িক আবেগের বিষয় নয়, এ দেশের ‘‌উন্নয়ন’-এর একটি অংশ। অর্ধশতাব্দী আগে দেশের উন্নয়নকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হিসেবেই দেখা হতো। তখন থেকে উন্নয়নের ধারণা পরিবর্তিত ও প্রসারিত হয়েছে, তাতে অন্তর্ভু্ক্ত হয়েছে জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন ও অংশগ্রহণ।

সেই ধরনের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন বৈষম্য হ্রাস ও সমতা। আর সে দিকগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত বাংলা ভাষার প্রসার। কীভাবে সেটা হয় তার ব্যাখ্যা ও সেই পরিপ্রেক্ষিতে করণীয় বিষয়ের আলোচনা জরুরি হয়ে উঠেছে।

বাংলা মাতৃভাষা, এমন মানুষের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এ দেশে। কাজেই এ ভাষার প্রসার, ভাষার উন্নয়ন, সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার এ দেশেরই সবার এবং বিশেষত নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব। 

এ পথে অগ্রসর হতে গেলে মনে রাখতে হবে যে এটা শুধু নীতিনির্ধারকদের তরফ থেকে চাপিয়ে দিলে হবে না, আবার একেবারে সব ক্ষেত্রে ব্যক্তি পছন্দের ওপর ছেড়ে দিলেও হবে না। কারণ ব্যক্তি বিশেষ কোন ভাষা কতটুকু শিখবে বা ব্যবহার করবে সেই সিদ্ধান্ত নেয় তার নিজের লাভ-ক্ষতির বিবেচনায় এবং শুধু তার জীবনের স্বল্প সময়সীমাকে বিবেচনা করে। অথচ এসব বিবেচনা একত্র করে জাতির জন্য সামগ্রিকভাবে যে মঙ্গল, বাংলা ভাষার উন্নয়নের জন্য যে অগ্রগতি প্রয়োজন তার সঙ্গে এক না হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি।

তার কারণ ব্যক্তির সিদ্ধান্তে সামাজিক ও সামগ্রিক উন্নয়ন বিষয়টি বিবেচিত হয় না। ব্যক্তির হিসাববহির্ভূত সামাজিক কল্যাণ সাধন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে ধীরে ধীরে বিভিন্ন নীতির মধ্য দিয়ে ব্যক্তির হিসাবকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে ব্যক্তির ও সামাজিক কল্যাণের ফারাক হ্রাস করাও সম্ভব। পরিবেশ দূষণ রোধ করাটাও একই ধরনের বিষয়।

এ কাজে অগ্রসর হতে হলে প্রথমেই দেখতে হবে যে বাংলা ভাষার (প্রমিত বাংলার) প্রসার এবং সর্বস্তরে প্রচলন ঘটছে কিনা। সরকারি কাজে নিয়ম অনুযায়ী তা হতেই হবে। কিন্তু বছরের পর বছর এদিকে অগ্রগতি হচ্ছে কিনা তা নিয়ে অনেক সময় সন্দেহ পোষণ করা হয়। কাজেই তা তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, কলেজে পাঠদানের ক্ষেত্রে এ প্রসার কেমন তা হিসাব করার (বা পরিবীক্ষণের) প্রয়োজন রয়েছে। সরকারি নথিতে মন্তব্য বা টীকা লেখার ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রমিত ভাষা ব্যবহার হচ্ছে নাকি ভাষাগত ভুল, ইংরেজি শব্দের মিশ্রণ এগুলো থেকে যাচ্ছে? এ বিষয়ে প্রতি বছর নমুনা জরিপ করে অগ্রগতি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে কতগুলো আকরগ্রন্থ বিগত বছরগুলোয় অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে সেটাও জানা দরকার। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সভায়, সেমিনারে কি বাংলায় প্রবন্ধ উপস্থাপন ও আলোচনা হচ্ছে? যদিও হয়, সেখানে কতগুলো বাক্যে ইংরেজি শব্দ (যার সহজ ও প্রচলিত বাংলা পরিভাষা আছে) ব্যবহার হচ্ছে? তাদের ওয়েবসাইটগুলোয় কত অংশ বাংলা?

সংসদে বিতর্কের কতটুকু অংশ প্রমিত বাংলায় চলেছে আর কতটুকুতে আঞ্চলিক ভাষা, ভুল উচ্চারণ, ইংরেজির মিশ্রণ ঘটেছে, তার খবর নেয়া যেতে পারে। 

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শতকরা কতজন ছাত্রছাত্রী বাংলায় পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখছে? সেটা বাড়ছে না কমছে? এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে গবেষণা করা দরকার। যদি এগুলো থেকে উত্তরণের প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হয় তবে হয়তো সাধারণ দৃষ্টিতে দোষনীয় নয়। কিন্তু বাংলা ভাষার উন্নয়ন এসব ক্ষেত্রেই শুরু হতে হবে। 

তারপর আসা যাক সাধারণ জনগণের মধ্যে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যক্তি খাতের পরিস্থিতি কেমন সে বিষয়ে। 

সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিভিন্ন ফরম, নিয়মাবলির তালিকা বাংলায় লেখা থাকে। স্কুল শিক্ষিতদের পক্ষে সেগুলো বোধগম্য। কিন্তু বেসরকারি ব্যাংকের পরিস্থিতি ভিন্ন। তাদের সেবা কি যাদের ইংরেজি জ্ঞান সীমিত, তাদের জন্য নয়?

ঢাকা শহরের কিছু দোকানে সাইন বোর্ডে বাংলায় লেখা নেই। শুধু ইংরেজি লেখা দেখেছি, এমনকি দু-একটিতে ইংরেজি ও আরবি। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের চোখে তা পড়েছে কি কখনো?

ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের ও চাকুরেদের ইংরেজি জ্ঞান কি জরুরি? নাকি বাংলায় ভালো দক্ষতা, গণিত, হিসাব জ্ঞান এগুলো বেশি দরকার? রফতানি বাণিজ্যে জড়িত প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের (একটি প্রতিষ্ঠানে কিছু অংশের) জন্য ইংরেজির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তাহলে সাধারণভাবে এ ধারণা কেন প্রচলিত যে ইংরেজি ভালো জানা থাকলে ভালো চাকরি পাওয়া যায়? সেই তুলনায় বাংলা জ্ঞানের বাজারদর কম মনে করা হয়। এ ধারণার কারণ ঘটে দুদিক থেকে- নিয়োগকারীরা সাধারণত ইংরেজি জ্ঞান যাচাই করে থাকেন। বাংলা ভাষায় দক্ষতা কতটা তার যাচাই বা সেক্ষেত্রে প্রার্থীদের তুলনা ততটা ঘটে না। অন্যদিকে সাধারণত তরুণদের মধ্যে যার ইংরেজি জ্ঞান সীমিত তার বাংলা ভাষার দক্ষতাও কম। কিন্তু চাকরিপ্রার্থী বিফল হলে ইংরেজি দক্ষতার অভাবটাকেই কারণ মনে করে থাকে। এসব অভিজ্ঞতার ফলস্বরূপ চাকরিসন্ধানী তরুণরা, স্কুলগামী ছেলেমেয়েদের অভিভাবকরা বাংলা দক্ষতা অর্জনের গুরুত্ব খাটো করে দেখতে থাকেন। শিশু ইংরেজি ছড়া মুখস্থ করছে বা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ছে, এটা তার ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলকর এবং বাবা-মায়ের সামাজিক অবস্থানের উচ্চতার নির্ধারক মনে করা হয়। এককালে যেটা উচ্চবিত্তদের মধ্যে সীমিত ছিল, এখন সেটা মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যার ফলে শিক্ষায় তাদের পারিবারিক ব্যয় বাড়ছে। তাতে শিক্ষার মোট অর্জন বাড়ছে কিনা সে বিষয়েও সন্দেহ। 

তবে শুধু ব্যক্তির লাভের বিবেচনা নয়, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলা ভাষার উন্নয়ন ও প্রসারের জন্য যে ব্যয় তা কি শুধুই ব্যয়ের খাতায় যাবে? নাকি তা থেকে কোনো প্রত্যর্পণ আশা করা যায়, যা শুধু জাতির আত্মসম্মান, ভাষার গৌরব নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে সুফলদায়ক? এ প্রশ্নের উত্তর কিন্তু ইতিবাচক হতে পারে, যদি সেই সুফল আহরণের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে।

স্কুল শিক্ষাজীবনে যারা বাংলায় ভালো দক্ষতা অর্জন করতে পারে, তারা পরবর্তী শিক্ষা সময়ে ইংরেজি দক্ষতা অর্জনে সময় বা অর্থ কম ব্যয় করে বাংলা ভাষা ও গণিত-বিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জনকে গুরুত্ব দিলে পরবর্তীকালে তারা উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে আসতে পারে। এসব দক্ষতা চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে, নিয়োগকারীদের যদি এগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন করার বিষয়ে সচেতনতা থাকে। এভাবে বাংলা ভাষার দক্ষতা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। বাংলার প্রসার ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে জোর দিলে সেসব ক্ষেত্রে নতুন কর্মোদ্যোগ বেড়ে যাবে যা সমাজ ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। যারা ইংরেজি জ্ঞানের অভাবে এগোতে পারছিলেন না, তাদের অংশগ্রহণ বাড়বে। 

অধিকতর কিছু পদক্ষেপ বাংলা ভাষাকে পেছনে ঠেলে রাখার বিপরীত স্রোত এনে দিতে পারে।

উপার্জন ও কাজের সুযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার উচ্চতর দক্ষতা যদি ভূমিকা রাখতে পারে তাহলে অনেকে সেই সুযোগ নিতে বাংলা ভাষাচর্চায় অগ্রসর হবে। এ সুযোগ বৃদ্ধির অনেক ধরনের কার্যক্রম হতে পারে। বাংলা ভাষা ব্যবহার করে কম্পিউটার সফটওয়্যার তৈরি করা যেতে পারে। প্রকাশকরা আরো বেশি অনুবাদ গ্রন্থ ও বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় গ্রন্থ প্রকাশ করবে। এসব ক্ষেত্রে সরকারের দিক থেকে প্রণোদনা দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। 

সরকার আরো কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে তরুণদের মধ্যে বাংলা জ্ঞান বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করতে পারে। যেমন বিসিএস পরীক্ষায় বাংলায় উচ্চতর দক্ষতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করে সেসব ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অর্জনের ভিত্তিতে কয়েকজনকে নিয়োগ দেয়ার নিয়ম চালু করা যায়। অবশ্যই অন্য সব ক্ষেত্রে ন্যূনতম ভালো ফল থাকতে হবে। অন্যান্য নিয়োগের জন্যও একই ধরনের নিয়ম থাকা দরকার।

শুধু এ ধরনের পুরস্কৃত করার নিয়ম সর্বব্যাপী আগ্রহ তৈরি করতে পারবে না। সঙ্গে কিছু বাধ্যতামূলক বাংলাচর্চা, উচ্চশিক্ষার অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জনের অংশ হওয়া উচিত। এসব পদক্ষেপ অবশ্য ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে নিতে হবে। তার আগে বিতর্ক ও আলোচনার প্রয়োজন হবে। 

তবে নীতি গ্রহণ ও উদ্ভাবনী ধারার কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে বাংলা ভাষার প্রসার সম্ভব হবে যদি সমাজে ব্যক্তিমানসে ও সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে যথাযথ সচেতনতা সঞ্চারিত হয় এবং আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকে। 


ড. রুশিদান ইসলাম রহমান: এক্সিকিউটিভ চেয়ারপারসন, সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চ এবং বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক